নিউইয়র্ক, ৬ অক্টোবর ১৯২৭।চলচ্চিত্রে শব্দের যুগের সূচনা।
‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ বদলে দিয়েছিল রুপালি পর্দার ভাষা
রুপালি পর্দায় তখন নীরবতার রাজত্ব। অভিনেতারা কথা বলতেন না, গল্প এগিয়ে যেত অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি আর পর্দায় ভেসে ওঠা কিছু লিখিত সংলাপের মাধ্যমে। সিনেমা হলে দর্শকের হাসি-কান্নার সঙ্গে থাকত পিয়ানো কিংবা অর্কেস্ট্রার সুর। ঠিক এমন এক সময়ে নিউইয়র্কের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল একটি চলচ্চিত্র—‘The Jazz Singer’। সেদিন পর্দায় শুধু একটি নতুন সিনেমার জন্ম হয়নি; বদলে যেতে শুরু করেছিল গোটা চলচ্চিত্রশিল্পের ভাষা।
অ্যালান ক্রসল্যান্ড পরিচালিত এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন জনপ্রিয় মার্কিন গায়ক ও অভিনেতা আল জোলসন। ১৯২৭ সালের ৬ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটি ‘ভিটাফোন’ প্রযুক্তির সাহায্যে চলচ্চিত্রের সঙ্গে শব্দকে সমন্বিত করে।
‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ পুরোপুরি কথ্য চলচ্চিত্র ছিল না। ছবিটির বড় অংশই ছিল নির্বাক চলচ্চিত্রের প্রচলিত ধারায় নির্মিত। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে আল জোলসনের গান ও সংলাপ সরাসরি শব্দসহ ধারণ করা হয়। বাস্তবে ছবিটিতে প্রায় দুই মিনিটের মতো সংলাপ ছিল। কিন্তু সেই অল্প কয়েক মিনিটই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তনের সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে জোলসনের গাওয়া গান ও তাঁর সংলাপ দর্শকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এতদিন যে অভিনেতাকে শুধু চোখের সামনে দেখা যেত, এবার তাঁর কণ্ঠও শোনা গেল। পর্দার মানুষটি যেন হঠাৎ করে দর্শকের আরও কাছে চলে এলেন।
এই বিপ্লবের পেছনে ছিল Vitaphone নামের একটি শব্দপ্রযুক্তি। চলচ্চিত্রের ছবির সঙ্গে আলাদা ডিস্কে ধারণ করা শব্দ সমন্বয় করে প্রেক্ষাগৃহে বাজানো হতো। একই সময়ে উন্নত বৈদ্যুতিক শব্দ ধারণ ও শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহারের ফলে দর্শকরা আগের তুলনায় অনেক পরিষ্কারভাবে গান ও সংলাপ শুনতে পারতেন।
ওয়ার্নার ব্রাদার্স প্রথমদিকে এই প্রযুক্তিকে মূলত নির্বাক চলচ্চিত্রে সংগীত ও শব্দপ্রভাব যুক্ত করার উপায় হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু দর্শকদের প্রতিক্রিয়া তাদের ভাবনা বদলে দেয়। মানুষ শুধু সিনেমা দেখতে নয়, সিনেমার চরিত্রদের কথা শুনতেও আগ্রহী হয়ে ওঠে।
আল জোলসন তখন আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় মঞ্চশিল্পী। তাঁর কণ্ঠ, অভিনয় ও মঞ্চ-উপস্থাপনা ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’-কে বিশেষ মাত্রা দেয়। ছবিতে একজন তরুণের গল্প বলা হয়, যে নিজের শিল্পীসত্তা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে টানাপোড়েনে পড়ে। এই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সঙ্গে সংগীত ও মঞ্চজগতের আকর্ষণ মিশে ছবিটিকে আবেগঘন করে তোলে।
জোলসনের কণ্ঠ যখন প্রথমবার পর্দার সঙ্গে মিলেমিশে দর্শকের কানে পৌঁছায়, তখন সেটি ছিল কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়—ছিল সিনেমার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়।
প্রথমদিকে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের সবাই নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাননি। ছবিটি নিয়ে সমালোচনাও ছিল মিশ্র। কিন্তু দর্শকদের আগ্রহ খুব দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ শত শত প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হতে থাকে। ছবিটির সাফল্য ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে শব্দযুক্ত চলচ্চিত্রে আরও বড় বিনিয়োগে উৎসাহিত করে।
এরপর হলিউডে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ শব্দপ্রযুক্তির জন্য সংস্কার করা শুরু হয়। ১৯২৮ সালে ‘The Lights of New York’ মুক্তির মধ্য দিয়ে পুরোপুরি কথ্য ফিচার চলচ্চিত্রের পথ আরও প্রশস্ত হয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ কার্যত অবসানের পথে চলে যায়।
আজকের দর্শকের কাছে সিনেমায় সংলাপ, গান কিংবা শব্দ যেন একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি ও শিল্পের দীর্ঘ এক অভিযাত্রা। ১৯২৭ সালের ৬ অক্টোবর ‘The Jazz Singer’ সেই অভিযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক বাঁক তৈরি করেছিল।
ছবিটি শুধু একটি সিনেমা ছিল না—এটি ছিল নীরবতা ভেঙে ওঠা প্রথম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরগুলোর একটি। সেই কণ্ঠস্বরই পরবর্তী সময়ে হলিউডের গল্প বলার ধরন, অভিনয়, সংগীত, প্রেক্ষাগৃহের প্রযুক্তি এবং দর্শকের সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাকে আমূল বদলে দেয়।
তাই ৬ অক্টোবর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শুধু একটি মুক্তির তারিখ নয়; এটি সেই দিন, যেদিন রুপালি পর্দা প্রথমবার আরও জোরে কথা বলতে শুরু করেছিল।