জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিল, ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়’ (সিভাসু)। আজ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট, বিশটি বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলা শেষে প্রতিষ্ঠানটি পা রাখছে এক নতুন দিগন্তে। শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রাণিসম্পদ এবং খাতের বৈপ্লবিক রূপান্তরের মাধ্যমে সিভাসু আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উৎকর্ষের অন্যতম শীর্ষকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আজ সিভাসুর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয় দূরদর্শী সেই মানুষকে যার অদম্য সাহসিকতা এবং জনমুখী নেতৃত্বের ফসল হিসেবে আজকের এই পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়- তিনি চট্টলদরদী আলহাজ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী।
একটি সুস্থ, সাবলীল ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার মূল ভিত্তি হলো একটি সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন জাতি এবং সমৃদ্ধ প্রাণিসম্পদ খাত। এই চরম সত্যটি নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন চট্টগ্রামের অভিভাবক ও সমাজসংস্কারক চট্টলদরদী আলহাজ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা, নিরাপদ প্রোটিনের জোগান এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় ভেটেরিনারি বা পশুপালন বিজ্ঞানের উন্নয়ন অপরিহার্য। তৎকালীন সময়ে দেশে বিশেষায়িত ও আধুনিক ভেটেরিনারি শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই বিশাল শূন্যতা পূরণে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তিনি প্রথম একটি স্বতন্ত্র ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চট্টগ্রামে ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রবর্তন ও বিকাশের লক্ষ্যে তিনি এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর এই মহান উদ্যোগে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট কাদেরী পরিবারের সন্তান, তরুণ-তুর্কী ও বীর সেনানী শাহেদুল আলম কাদেরী। ইউসুফ চৌধুরী ও শাহেদুল আলম কাদেরীর এই যুগলবন্দী চট্টগ্রামজুড়ে সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষকে জাগ্রত করে তোলে। মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী তাঁর এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা বাস্তবায়নে পাশে পান তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জননেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, পশুসম্পদ অধিদপ্তরের তৎকালীন দূরদর্শী মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. নাজির আহমদ এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথকে।
সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও ইউসুফ চৌধুরীর আপসহীন সামাজিক আন্দোলনের মুখে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে সূচনা ঘটে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক ভেটেরিনারি শিক্ষার এক নতুন অধ্যায়ের। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজের যাত্রা কিন্তু মসৃণ ছিল না। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। নতুন ক্ষাপটে তৎকালীন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া এই কলেজটিকে চট্টগ্রাম থেকে দিনাজপুরে সরিয়ে নেওয়ার এক অপচেষ্টা চালানো হয়। চট্টগ্রামের অধিকার হরণের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সর্বস্তরের জনগণ। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামবাসীর অভিভাবক হয়ে আবারো বীরের মতো এগিয়ে আসেন চট্টলদরদী মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, চট্টগ্রামের অধিকার কোনো অবস্থাতেই হাতছাড়া হতে দেওয়া হবে না। তিনি এ ব্যাপারে জোরদার আন্দোলনের ডাক দেন। চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণকে এক ছাতার নিচে এনে তিনি সিভিল সোসাইটি, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীর অদম্য ও আপসহীন নেতৃত্বের সামনে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয় ষড়যন্ত্রকারীরা। ভেটেরিনারি কলেজটি চট্টগ্রামেই বহাল থাকে এবং সাফল্যের সাথে এর শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় ১৮ একর পাহাড়ি ও প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ভেটেরিনারি কলেজটি তার আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম, হাতে-কলমে শিক্ষা ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে মাত্র ৬-৭ বছরের মধ্যেই দেশ ও বিদেশে অভূতপূর্ব সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়। তবে ১৮ একরের চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও চট্টলদরদী ইউসুফ চৌধুরীর স্বপ্ন কেবল একটি স্নাতক ডিগ্রি প্রদানকারী কলেজে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জানতেন, টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন গবেষণার প্রসার, মাননিয়ন্ত্রণ, স্নাতকোত্তর (এমএস) ও পিএইচডি স্তরের উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ এবং বিশ্বমানের সম্প্রসারণ সেবা। আর এসব অর্জনের একমাত্র পথ হলো কলেজটিকে একটি উচ্চতর গবেষণাধর্মী স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা। এই অদম্য তাগিদ থেকেই চট্টলদরদী ইউসুফ চৌধুরী গড়ে তোলেন ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি’। সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা হিসেবে ইউসুফ চৌধুরী নিজেই এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর তাঁর দক্ষ ডান হাত হিসেবে পরিচিত তরুণ-তুর্কী শাহেদুল আলম কাদেরীকে করা হয় সাধারণ সম্পাদক। এরপর দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নামেন রাজপথে।
ইউসুফ চৌধুরী দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ও আপামর জনতাকে এই আন্দোলনে শামিল করেন। শেষপর্যন্ত এটি আর কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবি থাকেনি, এটি পরিণত হয়েছিল চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবিতে। অবশেষে গণমানুষের এই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে। চট্টলদরদীর ঐতিহাসিক ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদে বহুল প্রতীক্ষিত ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হয়। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ৭ আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার কার্যক্রম শুরু করে। এর মাধ্যমে রচিত হয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এক নতুন ইতিহাস। জন্ম নেয় দেশের প্রথম বিশেষায়িত পাবলিক ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)। ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সফল উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
চট্টলদরদী মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীর অবদান কেবল আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী সময়েও তিনি সিভাসুকে একটি বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সিভাসুর সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা ও অর্থকমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সিভাসুর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজেট বরাদ্দ ও গবেষণা তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে মেধা ও বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রাখেন। সিভাসু ক্যাম্পাসকে একটি মনোরম, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সবুজ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তাঁর নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শিতা কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে প্রাণিচিকিৎসা ও গবেষণায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করতে পারে। আজ সিভাসুর যে দৃষ্টিনন্দন রূপ এবং একাডেমিক পরিবেশ, তার প্রতিটি ধূলিকণায় ইউসুফ চৌধুরীর মেধা ও শ্রম জড়িয়ে আছে।’
২০০৬ খ্রিস্টাব্দে অতি ক্ষুদ্রপরিসরে যাত্রা শুরু করলেও আজ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে দাঁড়িয়ে সিভাসু একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উৎকর্ষ কেন্দ্র (Centre of Excellence) হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে চারটি সমৃদ্ধ অনুষদের (ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ, ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদ, ফিশারিজ অনুষদ এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ) মাধ্যমে দেশের প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, খাদ্যবিজ্ঞান ও বায়োটেকনোলজি খাতে দক্ষ স্নাতক ও প্রাকটিসিং বিশেষজ্ঞ তৈরি করে আসছে। চারটি অনুষদের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অদম্য শিক্ষার্থীরা তাঁদের অহরহ পরিশ্রম, মেধা ও সততার ফলেই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে সিভাসু তার শিক্ষাগত উৎকর্ষ ও নতুন নতুন উদ্ভাবন বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। জুনোটিক রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ প্রোটিন উৎপাদন, ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতের আধুনিকায়নে সিভাসুর অবদান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে আজ।
সিভাসু দিবস ২০২৬-এ আমাদের সুদৃঢ় প্রত্যাশা- স্বপ্নদ্রষ্টা ও অভিভাবক ইউসুফ চৌধুরীর রোপিত এই বটবৃক্ষটি যেন প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ, খাদ্যনিরাপত্তা ও এক-স্বাস্থ্য (One Health) ধারণার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। আমরা আশা করবো- চট্টলদরদী ইউসুফ চৌধুরীর দূরদর্শী স্বপ্নের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সিভাসু বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীকে উপহার দেবে একটি সুস্থ, নিরাপদ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।