৮ অক্টোবর ১৮৭১–আগুনে পুড়ে ছাই এক শহর, ১৮৭১-এর গ্রেট শিকাগো ফায়ার।

 

শিকাগো, ৮ অক্টোবর ১৮৭১। সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে রাতের দিকে এগোচ্ছে। শহরের মানুষ দিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরেছে। কিন্তু কেউ জানত না, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের পরিচিত শহরটি পরিণত হবে আগুনের এক বিশাল সমুদ্রে। ডিকোভেন স্ট্রিটের কাছে একটি গোয়ালঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। ঠিক কীভাবে আগুন লেগেছিল, তার নিশ্চিত উত্তর আজও ইতিহাসের অন্ধকারে রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাথরিন ও’লিয়ারির গরুর লাথিতে লণ্ঠন পড়ে আগুন লাগার গল্পটি প্রচলিত থাকলেও ইতিহাসবিদেরা এখন স্পষ্টভাবে বলেন—ও’লিয়ারি পরিবারকে দায়ী করার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

সেদিনের শিকাগো ছিল দ্রুত বেড়ে ওঠা এক তরুণ নগরী। কাঠের তৈরি অসংখ্য বাড়ি, দোকান, গুদাম ও রাস্তার কাঠের অবকাঠামো শহরটিকে আগুনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছিল। তার ওপর ছিল দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়া এবং প্রবল বাতাস। ফলে ছোট্ট একটি আগুন মুহূর্তের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের বাড়ি থেকে বাড়িতে, গুদাম থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে; বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত কাঠ ও ছাই নতুন নতুন স্থানে আগুন ধরিয়ে দিতে থাকে।

রাত যত গভীর হতে থাকে, শিকাগোর আকাশ ততই লাল হয়ে ওঠে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে শুরু করে। কেউ নদীর দিকে, কেউ লেক মিশিগানের তীরে, কেউ আবার শহরের উত্তরের তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় পালানোর চেষ্টা করে। আগুন এত দ্রুত এগোচ্ছিল যে অনেকের হাতে ছিল শুধু কয়েক মুহূর্ত—প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। অসংখ্য পরিবার রাতের অন্ধকারে সন্তানদের হাত ধরে ছুটেছে, আর পেছনে রেখে গেছে তাদের ঘর, দোকান, স্মৃতি ও বহু বছরের সঞ্চয়।

আগুন থামানোর অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। কিন্তু ভয়াবহ আগুনে পানি সরবরাহের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হলে দমকলকর্মীদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এরপর আগুন শিকাগো নদী পার হয়ে শহরের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যায়। আদালত ভবন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হোটেল, দোকান—একটির পর একটি স্থাপনা আগুনের গ্রাসে চলে যেতে থাকে। এমনকি যেসব ভবনকে আগুন-প্রতিরোধী বলে মনে করা হতো, সেগুলোর ইট-পাথরও তীব্র তাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কোথাও লোহা গলে যায়, কোথাও দেয়াল ভেঙে পড়ে।

৮ অক্টোবরের রাতে শুরু হওয়া সেই আগুন ৯ অক্টোবর পেরিয়ে ১০ অক্টোবরের ভোর পর্যন্ত জ্বলতে থাকে। প্রায় তিন দিন ধরে চলা অগ্নিকাণ্ডে শিকাগোর প্রায় সাড়ে তিন বর্গমাইল এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। ১৮ হাজারেরও বেশি ভবন পুড়ে যায় এবং অন্তত তিন লাখ মানুষের শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক ৩০০ বা তার বেশি বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগুন যখন শেষ পর্যন্ত নিভে গেল, তখন শিকাগোর আকাশে আর আগের শহরটি ছিল না। যেখানে কিছুদিন আগেও ছিল প্রাণচঞ্চল রাস্তা, দোকানপাট ও বসতবাড়ি, সেখানে পড়ে ছিল পোড়া ইট, বাঁকানো লোহা, ছাই আর ধোঁয়া। হাজার হাজার মানুষ রাতারাতি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, সংবাদপত্রের কার্যালয়সহ নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অবকাঠামোও ধ্বংস হয়। আগুনের পরপরই শুরু হয় ত্রাণ ও আশ্রয়ের বিশাল কর্মযজ্ঞ; বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাহায্য আসতে থাকে বিপর্যস্ত শিকাগোবাসীর জন্য।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি শুরু হয় আগুনের পর। শিকাগো ধ্বংস হয়েছিল, কিন্তু শিকাগোবাসীর স্বপ্ন ধ্বংস হয়নি। ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়েই শুরু হয় পুনর্গঠনের কাজ। নতুন ভবন নির্মাণে আগুন-প্রতিরোধী উপকরণের ব্যবহার বাড়ে, নগর পরিকল্পনা নতুনভাবে ভাবা হয় এবং স্থাপত্যে শুরু হয় অভূতপূর্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। টেরাকোটা, ইট ও পরবর্তীকালে ইস্পাতের মতো উপকরণের ব্যবহার শহরের স্থাপত্যকে নতুন পথে নিয়ে যায়।

এই পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই শিকাগো ধীরে ধীরে পরিণত হয় আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম পরীক্ষাগারে। ১৮৮৫ সালে নির্মিত Home Insurance Building-কে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে যে শহর আগুনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, সেটিই আবার আমেরিকার অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য ও স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৮৯০ সালের মধ্যে শিকাগোর জনসংখ্যা প্রায় এক মিলিয়নে পৌঁছে যায় এবং ১৮৯৩ সালে শহরটি আয়োজন করে বিশ্বখ্যাত World’s Columbian Exposition।

গ্রেট শিকাগো ফায়ার তাই শুধু একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের ধ্বংসের মধ্যেও পুনর্জন্মের এক অসাধারণ গল্প। আগুন একটি শহরের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে পেরেছিল, কিন্তু তার ভবিষ্যৎকে পুড়িয়ে দিতে পারেনি। বরং সেই ছাই থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছিল আরও পরিকল্পিত, আরও উচ্চাভিলাষী এবং আরও আধুনিক শিকাগো।

১৮৭১ সালের সেই অগ্নিরাত্রি আজও ইতিহাসের পাতায় এক গভীর প্রতীক—কখনো কখনো একটি শহরের সবচেয়ে অন্ধকার রাতই তার নতুন ভোরের সূচনা করে। শিকাগোর আকাশে সেদিন যে আগুন লেলিহান শিখায় সবকিছু গ্রাস করেছিল, সেই আগুনের ছাই থেকেই কয়েক বছরের মধ্যে জন্ম নিতে শুরু করেছিল এক নতুন মহানগর। আর সেই কারণেই গ্রেট শিকাগো ফায়ার আজ শুধু ধ্বংসের স্মৃতি নয়—এটি মানুষের অদম্য প্রত্যয়, পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্ত উপাখ্যান।

Translate