বুধবার ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬

ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞায় ভেস্তে যাচ্ছে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনা এবং ওয়াশিংটনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ভারতের উচ্চাভিলাষী চাবাহার বন্দর প্রকল্প। রবিবার (২৬ এপ্রিল) চাবাহার প্রকল্পের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে দেওয়া ছাড়ের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়নের কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

বন্দর নিয়ে দুই দেশের চুক্তি কী?

ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে ওমান সাগরের তীরে অবস্থিত চাবাহার বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান এবং গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দরের উন্নয়ন ও পরিচালনায় ভারত অংশ নিয়েছে, যা তাদের প্রথম বড় বিদেশি বন্দর প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভারত মূলত চাবাহার বন্দরের শাহিদ বেহেশতি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। বন্দরের উন্নয়ন ও পরিচালনায় ভারতের অংশগ্রহণ মূলত নির্দিষ্ট অবকাঠামো ও পরিচালনার অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে ভারত ও ইরানের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মেয়াদ ১০ বছর। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইপিজিএল বন্দরের বেহেশতি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এর আগে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিচালনা চললেও এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল কাঠামো নিশ্চিত হয়।

ভারতের বিনিয়োগের পরিমাণ কত?

বিনিয়োগের দিক থেকে ভারত সরাসরি ও পরোক্ষ দুই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বন্দরের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি স্থাপন ও অপারেশন চালাতে প্রায় ৮৫-১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সরাসরি বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর বাইরে ইরানের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার জন্য ভারত প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণসুবিধাও অনুমোদন করে। এই অর্থ দিয়ে মূলত ক্রেন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম এবং টার্মিনাল সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করা হয়।

প্রকল্পের অংশ হিসেবে বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শুরুতে সীমিত পরিসরে পরিচালনা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বছরে কয়েক মিলিয়ন টন পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা ছিল। এই উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপন, জেটি উন্নয়ন এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত।

এ ছাড়া প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো চাবাহার থেকে জাহেদান পর্যন্ত রেলসংযোগ উন্নয়ন পরিকল্পনা, যদিও এই অংশটি মূলত ইরান নিজস্ব অর্থায়নে এগিয়ে নিচ্ছে। ভারতের প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই রেলপথে সহযোগিতা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেনি।

chabahar info- Bangla Tribune

চাবাহার কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের কাছে কেবল একটি বাণিজ্যিক বন্দর নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের একটি প্রধান কেন্দ্র। পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার না করে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পণ্য পাঠানোর জন্য এটিই ভারতের একমাত্র বিকল্প পথ।

চাবাহারের আরেকটি কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের কারণে। চীনের সহায়তায় নির্মিত এই বন্দরটির প্রভাব মোকাবিলায় চাবাহারকে বিকল্প অবস্থান হিসেবে দেখে ভারত। এছাড়া চাবাহার বন্দর ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (আইএনএসটিসি)-এর অংশ, যা ইরানের মাধ্যমে ভারত ও রাশিয়াকে যুক্ত করে।

কীভাবে এই সংকটে ভারত?

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপের নীতি গ্রহণ করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন জানায়, চাবাহারসহ ইরান সম্পর্কিত সব ছাড় বাতিল করা হবে। ভারতের ব্যাপক তদবিরের পর এই মেয়াদ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।

তবে এই ছাড়ের বিনিময়ে ভারতকে সেখানে কার্যক্রম কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে চাবাহারের জন্য কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি, যা গত এক দশকে প্রথম। এমনকি চাবাহার পরিচালনাকারী সংস্থা ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড (আইপিজিএল)-এর কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন এবং এর ওয়েবসাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভারতেই বিতর্ক

চাবাহার থেকে পিছু হটার এই গুঞ্জনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা মোদি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামান্য চাপে ভারতের এই পশ্চাদপসরণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি বড় বিপর্যয়। কতদিন ওয়াশিংটন আমাদের জাতীয় স্বার্থ নিয়ন্ত্রণ করবে?

দিল্লির বিকল্প কী?

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ বজায় থাকলে ভারতের হাত পা বাঁধা। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক র রাজন কুমার মনে করেন, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারতের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

এদিকে নয়া দিল্লি তাদের মালিকানা ইরানের কোনও সংস্থার কাছে হস্তান্তর করার কথা ভাবছে, যাতে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে তারা পুনরায় ফিরতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, চাবাহার এখন একটি ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে সন্তুষ্ট রাখা যদি ভারত সরকারের অগ্রাধিকার হয়, তবে এই প্রকল্প থেকে চূড়ান্ত প্রস্থানই হবে তাদের একমাত্র পথ।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপাতত তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Translate