৭ অক্টোবর ১৯৫৯: লুনা-৩-এর ক্যামেরায় প্রথমবার ধরা পড়ল চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠ।
পৃথিবী থেকে কোটি মানুষের চোখ যে চাঁদকে যুগের পর যুগ দেখেছে, তার একটি অর্ধেক ছিল মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। কবিতা, গান আর কল্পনায় চাঁদ ছিল পরিচিত এক স্বর্গীয় প্রতিবেশী—কিন্তু তার অন্য পাশটি যেন লুকিয়ে রাখা এক রহস্য। ১৯৫৯ সালের ৭ অক্টোবর সেই রহস্যের দরজা প্রথমবার খুলে দেয় সোভিয়েত মহাকাশযান লুনা-৩। মানুষের ইতিহাসে প্রথমবার চাঁদের পৃথিবী থেকে অদৃশ্য পৃষ্ঠের ছবি পৌঁছে যায় পৃথিবীতে।
চাঁদকে আমরা যে কারণে সবসময় প্রায় একই মুখে দেখি, তার কারণ হলো চাঁদের ঘূর্ণন ও পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের সময় প্রায় সমান—ফলে চাঁদের একই দিক সবসময় পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। তাই পৃথিবী থেকে চাঁদের অপর পাশ সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। সেই অদেখা অঞ্চলই পরবর্তীকালে পরিচিত হয়
মহাকাশে ছুটে গেল লুনা-৩
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৯ সালের ৪ অক্টোবর লুনা-৩ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করে। এটি ছিল চাঁদের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে তার অদেখা পৃষ্ঠের ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান। ৬ অক্টোবর এটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছ দিয়ে অতিক্রম করে এবং এরপর চাঁদের পেছনের দিকে চলে যায়।
পরদিন, ৭ অক্টোবর, চাঁদ থেকে প্রায় ৬৩,৫০০ থেকে ৬৫,২০০ কিলোমিটার দূরত্বে থাকা অবস্থায় লুনা-৩-এর ক্যামেরা সক্রিয় হয়। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে মহাকাশযানটি চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠের ছবি তোলে। মোট ২৯টি ছবি ধারণ করা হয়েছিল, যা চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা কভার করেছিল।
ছবিগুলো ছিল ঝাপসা, কিন্তু ইতিহাস ছিল স্পষ্ট
আজকের উচ্চ-রেজল্যুশনের মহাকাশচিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে লুনা-৩-এর ছবিগুলো ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দানাদার। কিন্তু সেই সময়ের জন্য ছবিগুলো ছিল অবিশ্বাস্য এক সাফল্য। মহাকাশযানের ভেতরেই ফিল্মটি রাসায়নিকভাবে ডেভেলপ ও শুকানো হয়। এরপর ছবিগুলো স্ক্যান করে রেডিও সংকেতের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হয়।
পৃথিবীতে পৌঁছানো সেই ছবিতে বিজ্ঞানীরা এমন এক চাঁদ দেখতে পেলেন, যা তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।
চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশে যে বিশাল কালো-ধূসর সমতল অঞ্চলগুলো দেখা যায়, সেগুলোকে বিজ্ঞানীরা maria বলেন—প্রাচীন আগ্নেয়গিরির লাভা জমে তৈরি হওয়া বিস্তীর্ণ সমভূমি। কিন্তু চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠে এমন অঞ্চল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বরং সেখানে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত বা impact craterছড়িয়ে আছে।
অর্থাৎ, চাঁদের দুই পাশ দেখতে প্রায় একই গোলকের হলেও তাদের ভূতাত্ত্বিক চেহারায় রয়েছে বিস্ময়কর পার্থক্য।
একটি ছবিই বদলে দিল চাঁদ সম্পর্কে ধারণা
লুনা-৩-এর পাঠানো ছবিগুলো শুধু নতুন কোনো দৃশ্য দেখায়নি; এগুলো চাঁদের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। অদেখা পৃষ্ঠে বিশাল আগ্নেয় সমভূমির সংখ্যা কম এবং গর্তের ঘনত্ব বেশি—এই বৈশিষ্ট্যগুলো চাঁদের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
তখন মানুষ প্রথমবার উপলব্ধি করল—পৃথিবী থেকে যে চাঁদকে আমরা চিনি, সেটিই পুরো চাঁদ নয়। তার পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূদৃশ্য, যেখানে কোটি কোটি বছরের মহাজাগতিক আঘাতের চিহ্ন জমে আছে।
মহাকাশ প্রতিযোগিতায় আরেকটি সোভিয়েত সাফল্য
ঘটনাটি ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র Space Race-এর সময়ে। এর মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫৯ সালের লুনা-৩-এর সাফল্য সেই মহাকাশ প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে আরও এগিয়ে দেয়। NASA-এর ইতিহাসভিত্তিক নথিতেও লুনা-৩-এর এই সাফল্যকে সে সময়ের মহাকাশ প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তবে লুনা-৩-এর ছবির মান খুব উন্নত ছিল না। তবু সেই অস্পষ্ট ছবির মধ্যেই ছিল মানুষের জ্ঞানের এক বিশাল অগ্রগতি—যে জায়গায় কোনো মানুষ কখনো চোখ রাখেনি, সেখানে প্রথমবার মানুষের তৈরি একটি যন্ত্র পৌঁছে তার ছবি তুলে আনল।
অদেখা চাঁদ আজ আর অজানা নয়
লুনা-৩-এর সেই প্রথম ছবির প্রায় পাঁচ দশক পর, ২০০৯ সালে NASA-এর Lunar Reconnaissance Orbiter (LRO)চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে তার অদেখা পৃষ্ঠের অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি ও মানচিত্র তৈরি করতে শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন লুনা-৩-এর তোলা ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের উচ্চমানের ছবিও তুলনা করতে পারেন।
আজ চাঁদের সেই অদেখা পৃষ্ঠ আর রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা নেই। সেখানে আমরা দেখতে পাই বিশাল গর্ত, পাহাড়, উপত্যকা ও প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অসংখ্য চিহ্ন।
তবু ১৯৫৯ সালের সেই প্রথম ছবির আবেদন আলাদা। কারণ সেটি ছিল প্রথমবার মানুষের চোখে পৌঁছানো এক অজানা পৃথিবীর ছবি।
৭ অক্টোবর তাই শুধু একটি মহাকাশযানের ছবি তোলার দিন নয়। এটি সেই দিন, যেদিন মানুষ নিজের গ্রহের গণ্ডি পেরিয়ে মহাশূন্যের এক চিরলুকানো পর্দা সরিয়ে বলেছিল—
চাঁদের যে মুখ এতদিন পৃথিবী দেখেনি, আজ আমরা তারও দিকে তাকাতে পেরেছি।