আবু ধাবির সঙ্গে আলজিয়ার্সের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনাটি কেবল পশ্চিম সাহারা, ইসরায়েল, লিবিয়া কিংবা সাহেল অঞ্চলে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যগুলোর যোগফল নয়। এসব মতপার্থক্য কয়েক বছর ধরেই বিরাজ করছিল। আসল পরিবর্তনটি ঘটেছে মূলত তাদের সম্পর্কের মধ্যবর্তী সমীকরণে। উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া এর আগে যেসব আঞ্চলিক বিরোধ পৃথকভাবে পরিচালনা করত, সময়ের ব্যবধানে সেগুলোকে ধীরে ধীরে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক নীতির বিরোধিতা করলেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল আলজেরিয়া। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাপ্রধান সাইদ শানেগরিহা আমিরাতের প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক যৌথ সামরিক সহযোগিতা কমিটির একাদশ অধিবেশন আয়োজন করেন। একই মাসে আবু ধাবিতে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠকে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং আলজেরীয় কর্মকর্তারা কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। এমনকি জনসমক্ষে দুই দেশের মধ্যে চরম তিক্ততা দৃশ্যমান হওয়ার পর, ২০২৪ সালের জুনে ইতালিতে জি-সেভেন সম্মেলনের ফাঁকে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলেমাজিদ তেবুন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ একে অপরের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ ও সৌজন্য বিনিময় করেন।
এই ধারাবাহিকতাটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ততদিনে আমিরাত সরাসরি আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত লায়উনে একটি কনস্যুলেট উদ্বোধন করে পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের দাবিকে সমর্থন জানায়, যেখানে আলজেরিয়া শুরু থেকেই স্বাধীনতাকামী পোলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এর পাশাপাশি আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এবং লিবিয়ায় সামরিক নেতা খলিফা হাফতারকে সমর্থন জোগায়। তা সত্ত্বেও এসব বিরোধের কোনোটিই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পুরোপুরি স্থবির করে দেয়নি। কয়েক বছর ধরে আলজিয়ার্স আমিরাতের আঞ্চলিক নীতির বিরোধিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান বজায় রেখেছিল।
তবে ২০২৩ সালের শেষের দিক থেকে এই পৃথকীকরণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে প্রসারিত ব্রিকস জোটে আলজেরিয়ার অন্তর্ভুক্তি ব্যর্থ হওয়ার জন্য দেশটির সরকারঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোতে আমিরাতের পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ানোকে দায়ী করা হয়। জোটটির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে না এলেও আলজেরীয় সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অন্য জায়গায়; আবু ধাবিকে আর কেবল বাইরের দূরবর্তী কোনো সংঘাতের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয় বরং আলজেরিয়ার নিজস্ব কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে থাকে।
অন্যদিকে, মালিতে আলজেরিয়ার অবস্থানের অবমূল্যায়ন তাদের জন্য আরও বড় কৌশলগত ধাক্কা হয়ে আসে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মালির সেনাবাহিনী তাদের রুশ সঙ্গীদের সহায়তায় প্রধানত তোয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের কাছ থেকে কিদাল দখল করে এবং পরের বছর জানুয়ারিতে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বাতিল করে বামাকো। এই শান্তি চুক্তি আলজেরিয়াকে দেশটির দক্ষিণ সীমান্তে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার দিয়েছিল। চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ায় উত্তর মালিতে আলজেরিয়ার প্রভাব ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।
অবশ্যই এই পরিস্থিতির জন্য কেবল আমিরাত একা দায়ী ছিল না; বামাকো, মস্কো এবং স্বয়ং আলজেরিয়ার নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্তের ভূমিকা ছিল। কিন্তু আমিরাতের উপস্থিতিও সেখানে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ছিল না। বামাকোর সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তারা জি-ফাইভ সাহেল আঞ্চলিক সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীতে ৩ কোটি ইউরো অনুদান দিয়েছিল এবং মালি সামরিক বাহিনীকে সাঁজোয়া যান সরবরাহ করেছিল। ফলে মালিতে আলজেরিয়ার নিজস্ব প্রভাব যখন কমতে শুরু করে, তখন আমিরাতের এই নিরাপত্তা উপস্থিতি আলজিয়ার্সের চোখে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে একটি আঞ্চলিক আগ্রাসনের অংশ বলে মনে হতে থাকে।
পরবর্তীতে এই কৌশলগত পরিবর্তন কেবল বৈদেশিক নীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানেও রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি আলজেরিয়ার হাই সিকিউরিটি কাউন্সিল প্রতিবেশী দেশগুলো ও সাহেল অঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এক ভ্রাতৃপ্রতীম আরব দেশের শত্রুতামূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সরাসরি না নেওয়া হলেও এই বিরোধটি সরাসরি আলজেরিয়ার সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থায় প্রবেশ করে। পরবর্তী দুই বছরজুড়ে রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা, বিচার মন্ত্রণালয়ের নেওয়া ব্যবস্থা এবং সরকারি গণমাধ্যমে একই উদ্বেগের প্রতিফলন বারবার উঠে আসে।
২০২৫ সালের মে মাসে স্কাই নিউজ আরাবিয়া আলজেরীয় শিক্ষাবিদ মোহামেদ এল-আমিন বেলঘিতের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে, যেখানে তিনি আমাজিগ পরিচয়কে একটি ‘ফ্রাঙ্কো-জায়নবাদী সৃষ্টি’ বলে বর্ণনা করেন। আলজেরিয়ায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। হাই কমিশন ফর আমাজিগিটি এই বক্তব্যের নিন্দা জানায় এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই সম্প্রচারকে জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে অভিহিত করে। ফলে একটি আমিরাতি সংবাদমাধ্যম আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ জাতীয় সংহতির বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট তেবুন এই পরিবর্তনকে পুরোপুরি স্পষ্ট করে তোলেন। আমিরাতের নাম উল্লেখ না করে তিনি ওই উপসাগরীয় দেশটির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন এবং সেই সাক্ষাৎকারেই আমিরাতি বিনিয়োগ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশির হুমকির কথা উল্লেখ করেন। এই জাতীয় অভিযোগগুলোর প্রত্যক্ষ প্রমাণ জনসমক্ষে না এলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট নিজেই এবার সম্পর্কটিকে কেবল আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে না দেখে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের ভেতরে এনে দাঁড় করান।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণেই এই রাজনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক বিচ্ছেদে রূপ নেয়নি। ২০২৪ সালের শুরু থেকে আলজেরিয়ার নোটারিদের আলজেরীয়-আমিরাতি তামাক অংশীদারিত্বের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর চুক্তি সম্পাদন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে একই খাতের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের তদন্তের আওতায় আনা হয়। তা সত্ত্বেও অন্য বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা বলবৎ ছিল। আমিরাতি লজিস্টিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড আলজিয়ার্স এবং জেন জেন বন্দরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়, আর আলজেরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তিয়ারেতে গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সাফাভ-কে আমিরাতের আবিল ইনভেস্টমেন্টের একটি যৌথ অংশীদারিত্ব হিসেবে তালিকাভুক্ত রাখে।
একই ধরণের বিলম্ব লক্ষ্য করা গেছে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও। আলজেরিয়া ফেব্রুয়ারিতে দ্বিপাক্ষিক বিমান পরিষেবা চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে, যদিও আমিরাতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নোটিশের সময়সীমার মধ্যে ফ্লাইট চালু রাখার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে আলজেরিয়া আমিরাতি নিবন্ধিত বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিলেও বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলোকে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে ছাড় দেওয়া হয়। অর্থাৎ কূটনৈতিক বিচ্ছেদের চূড়ান্ত মুহূর্তেও ব্যবহারিক বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ হতে সময় লেগেছে।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, সেপ্টেম্বরেই কেন এই চূড়ান্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত এল? কারণ কেবল মালি পরিস্থিতি দিয়ে এই সময় নির্ধারণ ব্যাখ্যা করা যায় না। আলজেরিয়া ও মালি এক গুরুতর দ্বিপাক্ষিক সংকট কাটিয়ে উঠে জুলাই মাসেই পুনরায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয় এবং তাদের আকাশসীমা চালু করে। কিন্তু বামাকোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি আবু ধাবির সঙ্গে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি, কারণ আমিরাতের সঙ্গে বিরোধটি ততদিনে অনেক ব্যাপক রূপ ধারণ করেছিল।
জুলাই মাসেই তেবুন উল্লেখ করেছিলেন যে, আলজেরিয়া আরও আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারত কিন্তু আরব বিশ্বের মধ্যে যেন কোনো নতুন বিভাজন তৈরি না হয় সে উদ্দেশ্যে তারা তা করা থেকে বিরত ছিল। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বহু আগেই একটি উপলব্ধ রাজনৈতিক বিকল্পে পরিণত হয়েছিল এবং এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নতুন ঘটনার প্রয়োজন ছিল না।
অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্রিকস জোট থেকে বাদ পড়া কিংবা মালিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারানো; এসবের পেছনে অনেকগুলো জটিল কারণ ছিল যার সঙ্গে বামাকো, মস্কোর সিদ্ধান্ত এবং আলজেরিয়ার নিজস্ব নীতি যুক্ত ছিল। ফলে একক কোনো বাহ্যিক অভিনেতার ওপর সব দোষ চাপানো সহজ নয়। তবে প্রকাশ্য কোনো আইনি নথি না থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এই পরিবর্তন অবহেলা করার মতো নয়।
সূত্র: মিডলইস্ট আই