এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা, কড়া প্রতিক্রিয়া চীনের

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান প্রতিযোগিতার মধ্যে ‘হুমকি’, ‘সংঘাত’ ও ‘ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা’র বয়ান প্রত্যাখ্যান করেছে চীন।

বেইজিং বলেছে, এ ধরনের বক্তব্য বিশ্বব্যাপী এআই ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং কোনও পক্ষেরই এতে স্বার্থ নেই।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, “হুমকি, সংঘাত ও ক্ষতিকর প্রতিযোগিতার বয়ান শুধু বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং এটি কারও স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”

তিনি বলেন, সব পক্ষের উচিত উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবার জন্য কল্যাণকর উপায়ে এআইয়ের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া এবং মানবকল্যাণের দিকে নজর রাখা।

চীনের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকজন নেতা প্রযুক্তিটির দ্রুত বিকাশ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। দারিও আমোদেই, জ্যাকব কক্সনসহ শিল্পখাতের ব্যক্তিরা সতর্ক করেছেন, এআইয়ের সক্ষমতা যদি বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নে গতি কমানোর ধারণার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার বক্তব্য, এআই প্রতিযোগিতায় যে দেশ এগিয়ে থাকবে, কৌশলগতভাবেও সেই দেশ বড় সুবিধা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতা কতটা সম্ভব?
বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি ও এআই শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে কোনও সমঝোতা করা কতটা সম্ভব—এ প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সামরিক অধ্যয়ন কর্মসূচির সহকারী অধ্যাপক চ্যাং জুন ইয়ানের মতে, এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে আরও নিরাপদভাবে এগোনোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সমঝোতা হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’।

তার মতে, এআই এখন দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্বার্থের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ধীর করার বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

এআইকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি উন্নত প্রযুক্তিতে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও এআই-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি রফতানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের এআই খাত এগিয়ে যাচ্ছে। ওপেন-সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দেশটির এআই উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, অত্যাধুনিক বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সেই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতে বিনিয়োগকারীরা যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালছেন, তার সমপরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক বেইজিং
এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও চীন নিজেও প্রযুক্তিটির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা এআইয়ের উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

চীনের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী চেন ইশিন রবিবার এক লেখায় বলেন, দেশটির উচিত ‘উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য’ বজায় রাখা। এআই-সংশ্লিষ্ট আইন ও নৈতিক নির্দেশিকা প্রণয়ন ও উন্নত করার পাশাপাশি ঝুঁকি প্রতিরোধের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হবে জনগণের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখা।

চেন ইশিন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাসহ ‘শত্রুতাপূর্ণ শক্তিগুলোর’ এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

আটলান্টিক কাউন্সিলের চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো কেন্টন থিবো সম্প্রতি লিখেছেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিং—দুই পক্ষের মধ্যেই অত্যাধুনিক এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে বোঝাপড়ার কিছু শক্তিশালী ইঙ্গিত রয়েছে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তিগত স্বার্থও রয়েছে। এতে চীনা এআই গবেষকেরা দেশের বাইরে তাদের তৈরি মডেলগুলো কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত ও বোঝার সুযোগ পাবেন।

বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বের চেষ্টা
এআই ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও চীন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ে বেইজিং ওয়ার্ল্ড এআই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করে, যার লক্ষ্য বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনার কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখা।

এছাড়া ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে রবিবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ওপেন-সোর্স এআইকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক ‘কমিউনিটি’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও এআই নিয়ন্ত্রণের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে সাবেক অ্যানথ্রপিক গবেষক জ্যাকব কক্সন গত সপ্তাহে সতর্ক করে বলেন, এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতি অস্তিত্বসংকটে পড়ার ‘জোরালো সম্ভাবনা’ রয়েছে।

এরপর দারিও আমোদেইসহ এআই শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রযুক্তির উন্নয়ন কিছুটা ধীর করা এবং আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন।

অল্টম্যান-নাদেলার সতর্কবার্তা
এআই উন্নয়নের গতি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন স্যাম অল্টম্যান এবং সত্য নাদেলাও।

অল্টম্যান সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এআই মডেলের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ও ‘অ্যালাইনমেন্ট’ প্রযুক্তিগুলোকে এগিয়ে রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

মাইক্রোসফটের প্রধান সত্য নাদেলা বলেন, এআইয়ের উন্নয়ন এমনভাবে পরিচালিত হতে পারে না, যার নিয়ন্ত্রণ মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকবে।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকিকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূলকথা হলো—চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে হবে, কারণ এআই প্রতিযোগিতায় যে দেশ জিতবে, কৌশলগত সুবিধাও তারাই পাবে।

চীনের সঙ্গে সমন্বিত ধীরগতি দরকার
এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার তীব্রতা সম্পর্কে সাবেক অ্যানথ্রপিক কর্মী কক্সন বিবিসিকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই নিয়ে বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা এড়াতে হলে চীনের সঙ্গে কোনও না কোনও ধরনের সমন্বিতভাবে উন্নয়নের গতি কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

তবে বাস্তবে এমন সমন্বয় করা কঠিন। কারণ এআই এখন কেবল বাণিজ্যিক প্রযুক্তি নয়; সামরিক সক্ষমতা, অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।

এ কারণে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা যতটা বাড়ছে, ততটাই বাড়ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও।

শি-ট্রাম্প বৈঠকে এআই
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে এআইকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

আগামী সপ্তাহের শীর্ষ বৈঠকের আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের মধ্যেও বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও এআই উন্নয়ন তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বে রয়েছেন হে লিফেং। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক আলোচনাতেও এআই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহযোগিতা জরুরি হলেও এ প্রতিযোগিতার কৌশলগত গুরুত্ব এত বেশি যে দুই পক্ষের জন্যই ঝুঁকি অত্যন্ত বড়।

হংকংভিত্তিক ফোরানি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চেসেন নেভেটের মতে, চীন যদি অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তিতে দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, ওয়াশিংটন সেটিকে কেবল একটি প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পরাজয় হিসেবে দেখবে না। বরং পরবর্তী শিল্পযুগের কৌশলগত অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানো হিসেবে বিবেচনা করবে।

ফলে এআইয়ের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের গতি কমানোর প্রশ্নটি এখন আর কেবল প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়। এটি ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

Translate