বুধবার ২৭শে মে, ২০২৬

সরকারি চাল ‘পাঁচমিশালিতে’ দ্বিগুণ দামে বিক্রি

বহদ্দারহাটের বাদুরতলার বাসিন্দা মুক্তা বড়ুয়া এক বস্তা কাটারি চাল কিনেছেন বহদ্দারহাট বাজার থেকে। কিন্তু সেই চালে ভাত হয় ‘পাঁচমিশালি’। আরেক গৃহবধূ বললেন, পাহাড়তলী চালের বাজার থেকে কেনা একই মানের চালেও ভিন্ন রকমের ভাত হচ্ছে।

এই খটকার বিষয় নিয়ে কথা হয় নগরের বড় চালের পাইকারি মোকাম চাক্তাই ও পাহাড়তলী বাজারের দুই ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে। কথা হয় আরও কয়েকজন চাল ব্যবসায়ীর সঙ্গে। কিন্তু তারা কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘একটি চক্রের দীর্ঘদিন ধরে চাল নিয়ে এই ধরনের কারসাজি চলে আসছে। গত সরকার আমলে ক্ষমতার দাপটে সরকারি চাল নিয়ে নিয়ে চালবাজি করে আসছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার চাল কারসাজি করে দামি ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে বাজারে বিক্রি করে আসছে। চাক্তাই ও পাহাড়তলী চাল বাজারে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম বলেন, ‘কিছু কিছু ব্যবসায়ী গোপনে মিক্সার করে এ ধরনের অপব্যবসা করে আসছেন। প্রশাসনের অগোচরে শহরের বাইরে নিজস্ব গুদামে এসব অপকর্ম করছেন। কেনার পর ক্রেতারা ঠকছেন। কাকে মেরে কে পয়সাওয়ালা হবে সেই প্রতিযোগিতা চলছে। ঈমানি দায়িত্ব না থাকায় ব্যবসার পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে।’

কীভাবে সরকারি চাল যাচ্ছে বাজারে : ডিও ব্যবসায়ী, চাল ব্যবসায়ী নেতা ও চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রণোদনার চাল কেনেন ডিও ব্যবসায়ীরা। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার এসব চাল কেজিপ্রতি ৪০ টাকার কাছাকাছি ধরে কেনা হয়। অনেক সময় তার কম-বেশিও হয়। সেই চাল কয়েক হাত ঘুরে বস্তা বদলে যায় খোলা বাজারে। এরমধ্যে অসাধু চক্রটি সরকারি চাল দামি ব্র্যান্ডের চালে মিশিয়ে ৭০-৭৫ টাকা দরে বাজারজাত করে আসছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন ব্যবসায়ী বলেন, সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ ছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকে চাল কিনে। একেক গুদামে একেক দেশের চাল যায়। এসব চাল মিক্সারের পর রান্না করা ভাতের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হবে-এটা স্বাভাবিক।

 

দামি ব্র্যান্ডের বস্তায় সরকারি চাল: গত ১৩ মে নগরের পাশের উপজেলার সীতাকুন্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কেশবপুরের কদমরসুল এলাকায় সালেহ কার্পেট নামে বন্ধ একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ১১ হাজার ৫৭৫ বস্তা চাল জব্দ করেছিল র‌্যাব। প্রতিটি বস্তায় ৫০ কেজি করে চাল রয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে র‌্যাব সদস্যরা সরকারি খাদ্যগুদামের চালের বস্তা পেয়েছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আব্দুল আজিজ নামের একজনকে আটক করা হয়।

 

২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট ৯০০ বস্তা সরকারি চাল নিয়ে তিনটি ট্রাক রওনা হয়েছিল খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। পরদিন (২৫ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট সংলগ্ন মডার্ন ন্যাশনাল কটন মিলসের ভেতরে আনলোড করার প্রস্তুতির সময় পুলিশ আটক করে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওইদিন খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা রাজীব কুমার দে বলেন, ‘মিরসরাইয়ের চাল ব্যবসায়ী আবদুল আজিজের গুদাম থেকে ৫৭৮ টন চাল জব্দ করা হয়। এরমধ্যে সরকারি সিলযুক্ত চাল পাওয়া যায় প্রায় ৫৮ টন। এসব চাল নূরজাহানসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বস্তায় প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল।’ তিনি বলেন, ‘নাজিরহাটের জেবল ট্রেডার্স ও পাহাড়তলীর ওমর ফারুকের হাত ঘুরে এসব সরকারি চাল ওই গুদামে গেছে।’ পার্বত্য জেলার শান্তকরণ কর্মসূচির চাল চট্টগ্রামের কোনো গুদাম থেকে বের হয় না।

 

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রাজীব কুমার দে বলেন, গুদামজাতকারীর খাদ্য গুদামজাতকরণের কোনো লাইসেন্স নেই। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

ডিও ব্যবসার আড়ালে চালবাজি: পাহাড়তলী চাল বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, সরকারি চাল দীর্ঘদিন ধরে নামি-দামি ব্র্যান্ডের নামে বাজারে চলে আসছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন গুদামের চাল বাজারে বেশি আসে। ডিও ব্যবসায়ী, চাল ব্যবসায়ী ও পরিবহন ঠিকাদারের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাল পাচার হয়ে আসছে। চাক্তাই, পাহাড়তলী ও নাজিরহাটকেন্দ্রিক একাধিক সিন্ডিকেট চাল পাচারের সঙ্গে জড়িত। গত সরকার আমলে এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের (রাজনীতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রভাবশালী নেতাদের প্রভাবে বেপরোয়া ছিল এসব সিন্ডিকেট। সরকারি চাল পাচারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছিল। তবে ক্ষমতার দাপটে তা ধামাচাপা দেওয়ার মতো অভিযোগও উঠেছিল। ২০২২ সালের ২৮ জুন নগরীর চাক্তাই এলাকার রাজাখালীর মোশাররফ হোসেন রোডে সরকারি খাদ্যবান্ধব চাল খালাসের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ট্রাক চালক ও হেলপারকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল পাচারের নায়ক যুবলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতা। চাক্তাই, পাহাড়তলী ও পার্বত্য জেলাকেন্দ্রিক সেই পুরোনো সিন্ডিকেট ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চাক্তাইকেন্দ্রিক এক সিন্ডিকেটের নামে-বেনামে একাধিক পরিবহন ঠিকাদার থাকার সুবাদে চাল পাচারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

 

২০২৩ সালে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম কায়ছার আলী সরকারি খাদ্য গুদামের চাল পাচার ঠেকাতে ১০ সেকেন্ডের ছবি ও ভিডিও বার্তা চালু করেছিলেন। খাদ্য গুদাম থেকে চাল-গম নিয়ে ট্রাক ছেড়ে যাওয়া এবং পৌঁছানোর ভিডিওচিত্র পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ইনভয়েস গ্রহণের ছবিও পাঠাতে হবে।

Translate