দেশজুড়ে এখন অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রকোপ চলছে। এর মাঝেই ঈদের ছুটিতে লাখো মানুষ শহর থেকে গ্রামে ফিরছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবাধ যাতায়াত ও শিশুদের মেলামেশা এই সংক্রমণকে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, ঈদ আনন্দের এ যাত্রায় হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও করছেন শিশু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় ইতিমধ্যে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গসহ হামে মারা গেছে ১২ জন শিশু। চিকিৎসকেরা বলছেন, বাতাসে কোভিডের চেয়েও দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে ছড়ায় এই রোগ। উৎসবের অসচেতনতায় আক্রান্ত বা উপসর্গহীন শিশুদের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ঈদের পর গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে সংক্রমণের বিস্তার রোধে সরকার ঈদে যাতায়াতে কঠোর বিধি-নিষেধ ও লকডাউন আরোপ করেছিল, যার ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে যাতায়াত কমিয়েছেন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদে কোনো বিধি-নিষেধ না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত বা উপসর্গহীন হাজারো শিশু শহর থেকে সপরিবারে গ্রামে যাবে। হাম একটি তীব্র বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় উৎসবের অবাধ মেলামেশায় এটি ঈদের পর গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর রোগীর তীব্র চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোভিডের চেয়েও দ্বিগুণ সংক্রামক হাম : বাতাসে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই রোগটি বর্তমান পরিস্থিতিতে কোভিডের চেয়েও দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরেছেন চিকিৎসকেরা। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, হাম বা মিজলস বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা মারাত্মক সংক্রামক, তা সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে। কোভিডের সময়ে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি যেখানে ৭ থেকে ৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারত, সেখানে হামে আক্রান্ত একটি শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে তার আশেপাশের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ জন শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। অর্থাৎ, কোভিডের চেয়েও এটি দ্বিগুণ ছোঁয়াচে। ফলে ঈদে যখন এক এলাকার শিশুরা অন্য এলাকার শিশুদের সাথে মেলামেশা ও খেলাধুলা করবে, তখন এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
সংক্রমণের এই গাণিতিক ভয়াবহতার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক (চ.দা) ডা. জেবীন চৌধুরী বলেন, হামের ‘রিপ্রোডাক্টিভ নম্বর’ বা আর-নট অত্যন্ত বেশি, যা প্রায় ১২ থেকে ১৮। অর্থাৎ, একজন আক্রান্ত শিশু অনাক্রান্ত এবং টিকাহীন ১২ থেকে ১৮ জন শিশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। ঈদের এই গণ-স্থানান্তরের কারণে যারা টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে, তারা খুব সহজেই ভাইরাসের সংস্পর্শে চলে আসবে। তাছাড়া, হামের ভাইরাস বাতাসে বা আক্রান্ত শিশুর ড্রপলেটে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় ও ভেসে থাকতে পারে। বদ্ধ ঘর বা ঘনবসতিপূর্ণ পারিবারিক জমায়েতে একটি আক্রান্ত শিশুই পুরো পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
নতুন ভ্যারিয়েন্টের ওয়েভ ও চিকিৎসকদের তাগিদ : চলতি প্রাদুর্ভাবের পেছনে কেবল টিকা না নেওয়া দায়ী নয়, বরং ভাইরাসের নতুন রূপের আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা। অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ জানান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা-এটি বাতাসে হামের নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্টের কারণে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে নাসারন্ধ্রের পিছনের অংশের সোয়াব নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করলেও, এটি আসলে কোন ভ্যারিয়েন্ট তা এখনো চিহ্নিত করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সিভিল সার্জন অফিস বা জনস্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে হাইলি ইনফেকশিয়াস বা উচ্চ সংক্রমণ প্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ সতর্কতা জারি করা প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভ্যাকসিন দেওয়ার পর একটি শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত তিন সপ্তাহ বা ২১ দিন সময় লাগে। কিন্তু ঈদের এই যাতায়াতের কারণে তিন সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই সুস্থ শিশুরা আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছে।
ঝুঁকিতে ৫ শ্রেণির শিশু : চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু আইসিইউ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার জানান, ঈদে সংস্পর্শ বাড়ার কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তীব্র। তিনি এই পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণিকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে যেসব শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি, যাদের টিকার ডোজ অসম্পূর্ণ, ৬ মাসের কম বয়সী শিশু, অপুষ্ট বা কম ওজনের শিশু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন শিশুরা।
ডা. মিশু তালুকদার আরও সতর্ক করে বলেন, হামকে শুধু জ্বর আর র্যাশের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, চোখের জটিলতা এমনকি বিরল ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতাও তৈরি করতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে শিশুর টিকাদান অবস্থা যাচাই করা, ঈদে ঘরমুখো যাত্রাপথে হাত পরিষ্কার রাখা, অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও বন্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় অবস্থান কমানো এবং শিশু অসুস্থ হলে ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবের আমেজেও জরুরি ঘরোয়া আইসোলেশন : ঈদের আনন্দের মধ্যে আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেশনে বা আলাদা রাখা কঠিন হলেও তা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. জেবীন চৌধুরী। তিনি কিছু বাস্তবমুখী উপায়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, আক্রান্ত শিশুকে বাড়ির একটি নির্দিষ্ট এবং আলো-বাতাসযুক্ত কক্ষে রাখতে হবে, যাতে তার ব্যবহৃত খেলনা, থালা-বাসন বা তোয়ালে অন্য শিশুরা ব্যবহার না করে। তাকে ঘরেই বিনোদনের মাধ্যমে ব্যস্ত রাখতে হবে এবং পরিবারের যেকোনো একজন সুস্থ ও পূর্ণ-টিকা প্রাপ্ত সদস্য তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেবেন।
তবে চিকিৎসকেরা কিছু বিপদসংকেত দেখামাত্র শিশুকে দেরি না করে দ্রুত সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অনবরত বমি হওয়া এবং শিশু কিছু খেতে বা বুকের দুধ পান করতে না পারা, তীব্র ডায়রিয়া এবং এর ফলে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় জ্বর হওয়া, খিঁচুনি হওয়া বা শিশু নিস্তেজ ও অজ্ঞান হয়ে পড়া, চোখে কর্নিয়ার আলসার বা তীব্র প্রদাহ এবং কানে পুঁজ হওয়া।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা : সংক্রমণের এই বিস্তারকে ঢালাওভাবে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন না বলে একে একটি নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক সংক্রমণ হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটি চট্টগ্রামের সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া। তিনি বলেন, করোনা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে যেভাবে সব বয়স বা লিঙ্গের মানুষের মধ্যে সর্বত্র সংক্রমণ ছড়াত, হামের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এটি প্রধানত ছোট শিশুদের রোগ। ফলে এটি মূলত শিশু কমিউনিটির মধ্যেই ছড়াবে। কাজেই শিশুর অভিভাবক যেন সতর্ক থাকেন যাতে কোনো আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি সুস্থ শিশু না যায়।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য বিভাগের করণীয় এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্য বিভাগ অতিরিক্ত সতর্কতামূলক পোস্টারিং, মাইকিং বা স্থানীয় কেবল টিভির মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারে। তবে এই ক্যাম্পেইন করার সময় একটি বিষয় কঠোরভাবে মাথায় রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন হামাক্রান্ত পরিবারগুলোকে সামাজিকভাবে বয়কট ও অবজ্ঞা করা না হয়। আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সদয় ও যত্নশীল থেকে স্রেফ অনাক্রান্ত শিশুদের দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে সমাজে কোনো অনাকাক্সিক্ষত আতঙ্ক তৈরি না হয়।