শুক্রবার ২২শে মে, ২০২৬

৩৮ মাসে বিশ্বের বৃহত্তম রেলস্টেশন! রোবট বাহিনী দিয়ে চীনের অবিশ্বাস্য কীর্তি

সদ্য সমাপ্ত গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের সফরসঙ্গী দলের অংশ হিসেবে ইলন মাস্ক চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) চীনের চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণের একটি ভিডিও শেয়ার করেন। মেঝের আয়তনের দিক থেকে এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেলস্টেশন।

গণপরিবহন নিয়ে অতীতে বহুবার সংশয় প্রকাশ করা ইলন মাস্ক কেন এই ভিডিও শেয়ার করলেন— তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে এর চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে স্টেশনটির নির্মাণকাহিনী। কারণ, মানুষ ও রোবটের সমন্বয়ে মাত্র ৩৮ মাসে এই বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করে নতুন নজির গড়েছে চীন।

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অভ্যন্তরে অবস্থিত চংকিং শহরটি জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক পরিসরের দিক থেকে দেশটির বৃহত্তম শহরগুলোর একটি এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। দ্রুত বাড়তে থাকা যোগাযোগ চাহিদা পূরণ এবং বিদ্যমান উত্তর স্টেশনের ওপর চাপ কমাতে নির্মাণ করা হয়েছে চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন।

এটি কেবল একটি রেলস্টেশন নয়, বরং বিশাল বহুমুখী ট্রানজিট কমপ্লেক্স। ২০২৫ সালের মে মাসে সাধারণ মানুষের জন্য এটি উন্মুক্ত করা হয়। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে বড় অবকাঠামো প্রকল্প শেষ করতে কয়েক দশক সময় নেয়, সেখানে চীন ১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটারের এই বিশাল স্টেশন নির্মাণ করেছে মাত্র তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে।

১ দশমিক ২২ মিলিয়ন বর্গমিটার আয়তনের এই স্টেশনে রয়েছে ১৫টি প্ল্যাটফর্ম ও ২৯টি ট্র্যাক, যা তিনটি পৃথক রেল ইয়ার্ডে বিভক্ত। ব্যস্ত সময়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬ হাজার যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এর। ৮ তলা বিশিষ্ট এই কমপ্লেক্সে হাই-স্পিড রেল, সাধারণ রেল, মনোরেল, বাস ও ট্যাক্সি— সব ধরনের পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বিত সুবিধা রাখা হয়েছে।

সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের মে মাসে নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৮ মাসে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে মূলত এক ‘রোবট বিপ্লব’-এর কারণে।

৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রা এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরিচালিত এই নির্মাণকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক রোবট প্রযুক্তি। লেজার-গাইডেড ফোর-হুইল স্ক্রিড রোবট— যাতে ছিল লাইডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফাইভ-জি প্রযুক্তি— মানুষের তুলনায় তিন গুণ দ্রুত এবং মিলিমিটার-নির্ভুলভাবে কংক্রিট লেভেলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করেছে। এতে শ্রম ব্যয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

এ ছাড়া ৮০০ কেজি ওজনের কাঁচের প্যানেল বসানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ গ্লাস ইনস্টলেশন রোবট। এগুলো সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় তিন গুণ দ্রুত কাজ করেছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। নির্মাণকাজে আরও যুক্ত ছিল অমনিডাইরেকশনাল ওয়েল্ডিং রোবট ও ২৪ ঘণ্টা টহল দেওয়া পাহারাদার রোবট।

চায়না রেলওয়ে ব্যুরোর কর্মকর্তাদের দাবি, রোবোটিক্স ব্যবহারের ফলে শ্রম ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, কাজের গতি বেড়েছে তিন গুণ এবং নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনা কমেছে ৯০ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, চংকিং ইস্ট রেলওয়ে স্টেশন শুধু একটি আধুনিক রেলস্টেশন নয়; এটি বৃহৎ শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অবিশ্বাস্য গতি প্রদর্শনের প্রতীক। আর সম্ভবত এই কারণেই বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও ভিডিওটি শেয়ার না করে থাকতে পারেননি।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ও সিনহুয়া

Translate