পারস্য উপসাগরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দুই মাসব্যাপী সংঘাত এক চরম অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। যদিও বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবে যুদ্ধের মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর ও জাহাজগুলো অবরোধ করে রেখেছে। অন্যদিকে ইরান মার্কিন জাহাজে হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন দরকষাকষি চলছে, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি কী?
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই যুদ্ধের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইরানিরা ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং আলোচনায় আমেরিকানদের কোনও সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই। ইরানি নেতৃত্বের হাতে একটি গোটা জাতি (যুক্তরাষ্ট্র) অপদস্থ হচ্ছে।
মের্ৎসের এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প জার্মানিতে মোতায়েন করা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ট্রাম্পের ‘একলা চলো’ নীতি এবং মিত্রদের প্রতি উদাসীনতা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নড়বড়ে করে তুলছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, গত দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম অধিকাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করছেন যে, তাদের দেশ অন্যদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ওয়াশিংটনের এই অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য এক বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের এক ‘দায়িত্বশীল বিশ্বশক্তি’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। এখন ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল পররাষ্ট্রনীতি চীনকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউয়েন ইউয়েন অ্যাং-এর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ চীনকে কিছুটা বেকায়দায় ফেললেও ইরান যুদ্ধ তাদের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এটি চীনকে একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছে।
কেন পশ্চিমারা বেইজিংগামী?
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমা নেতাদের বেইজিং সফরের হিড়িক পড়েছে। এটি মূলত ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চীনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ার এক সুক্ষ্ম প্রচেষ্টা। গত এপ্রিলে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজের সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিং বলেছিলেন, চীন ও স্পেন ইতিহাসের ‘সঠিক পক্ষে’ রয়েছে এবং দেশ দুটির উচিত পেশিশক্তির রাজনীতির বিরোধিতা করা।
চীনা নীতিনির্ধারকরা এই মুহূর্তে বাজারে স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের নিশ্চয়তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক জুলিয়ান গেউইর্টজ বলেন, শি জিনপিং এখন ট্রাম্পের অস্থির বিশ্বের বিপরীতে নিজের আত্মবিশ্বাস ও স্থিতিশীলতাকে তুলে ধরছেন। যদিও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে চীনের অর্থনীতিও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবে শি বিশ্বাস করেন যে, কষ্ট সহ্য করে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের বেশি।
চীনের আধিপত্য কোথায়?
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এশীয় দেশগুলোকে নতুন ভাবনায় ফেলছে। তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে তারা এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। চীন আগে থেকেই এই খাতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। গত মার্চ মাসে চীনা সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয়েছে।
ব্রিটেনের জ্বালানি সচিব এড মিলিব্যান্ড স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, খনিজ জ্বালানি নিরাপত্তার যুগ শেষ হয়ে আসছে এবং এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিরাপত্তার সময়। ট্রাম্প প্রশাসন যখন খনিজ জ্বালানির প্রাচুর্য নিয়ে ব্যস্ত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে, তখন চীন নিরবে এই বিশ্বব্যাপী রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে চীন?
সামরিক দিক থেকেও চীন এই যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়া থেকে বড় ধরনের সামরিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আপত্তি সত্ত্বেও সেখানে মোতায়েন করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ও টমাহকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত খরচ করে ফেলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্ররা এখন আশঙ্কা করছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান চীনের প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করবে।
এছাড়া চীন এই যুদ্ধে মার্কিন রণকৌশল, বিশেষ করে ড্রোন ও এআই-চালিত অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহার খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী চেন ইক্সিন উল্লেখ করেছেন যে, এই সংঘাত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গভীর প্রয়োগ বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে।
শি-ট্রাম্প বৈঠক ও নতুন সমীকরণ
বেইজিংয়ে নির্ধারিত ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের একটি শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে এই বৈঠকটি কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে চীনের বেশ কিছু তেল শোধনাগার ও শিপিং ফার্মের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। বিপরীতে চীনও নতুন নিয়ম জারি করেছে যা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য চীন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক আলি ওয়াইন মনে করেন, ইরান যুদ্ধের পর শি জিনপিং এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। চীনকে ছাড়া ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়াতে গ্যালিয়াম নামক যে খনিজ প্রয়োজন, সেটির উৎপাদনেও চীনের একাধিপত্য রয়েছে।
চীনের সীমাবদ্ধতা কোথায়?
এত কিছুর পরও চীনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকট। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিং মার্কিন নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে বাণিজ্য চালিয়ে এসেছে। এখন তারা এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে পারছে না। শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও তা কার্যকর হয়নি।
বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রধান এসফান্দিয়ার বাতমানঘেলিদজ বলেন, হয়তো এই যুদ্ধ শেষে চীনের বিশ্ব নেতৃত্ব নিয়ে আমরা নতুন কোনও প্রশংসা করব না। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত যে, আমেরিকান নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা এবং শ্রদ্ধা আগের চেয়ে অনেক কমে যাবে।
সূত্র: নিউ ইয়র্কার
