রবিবার ৩রা মে, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার স্বীকৃতির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডম্যান।

প্রস্তাবটিতে ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে বাঙালি জাতি এবং বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো বর্বরতাকে ‘গণহত্যা’, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এই হত্যাযজ্ঞে সহায়তাকারী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্য নথিভুক্ত করা এবং এই ধরণের অপরাধ যেন আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতেই এই প্রস্তাব আনা হয়েছে বলে রেজোলিউশনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার স্বীকৃতির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রস্তাব

কংগ্রেসম্যান ল্যান্ডম্যানের উত্থাপিত এই রেজোলিউশনে (এইচ. রেজ. ১১৩০) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাঙালিদের ‘নিচু জাতের মানুষ’ মনে করত এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো যৌথভাবে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে।

প্রস্তাবে তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও দাফতরিক নথি উদ্ধৃত করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যার বিষয়ে বলা হয়েছে, যদিও নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে, তবে প্রস্তাব অনুযায়ী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে কয়েক লক্ষ পর্যন্ত।

নারীর ওপর সহিংসতার বিষয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় দুই লাখেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। কলঙ্কের ভয়ে তাদের প্রকৃত সংখ্যা বা সঠিক তথ্য হয়তো কখনোই জানা যাবে না।

প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের ১৩ জুন ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘জেনোসাইড’ কলামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে হত্যার যোগ্য ব্যক্তিদের একটি তালিকা ছিল।

এছাড়া তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে পাঠানো টেলিগ্রামের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ওই টেলিগ্রামে আর্চার ব্লাড একে ‘বাছাইকৃত গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় হিন্দু ও বাঙালিদের পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি নিধন করলেও হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বরের রিপোর্টের বরাতে বলা হয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর পরিকল্পিত ত্রাস চালানো হয়। তাদের জমি ও দোকান লুট করা হয় এবং অনেক জায়গায় তাদের গায়ে ‘এইচ’ চিহ্নিত হলুদ রঙ লাগিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস-এর এক আইনি সমীক্ষাতেও হিন্দুদের ওপর এই পরিকল্পিত গণহত্যার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত এই প্রস্তাবে চারটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানানো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের ইসলামপন্থি সহযোগীরা নির্বিচারে বাঙালি হত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন এবং নারীদের যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখলেও মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ‘নির্মূল’ করার জন্য বিশেষ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল বলে স্বীকার করা, কোনও একটি জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের কোনও সদস্যের কৃত অপরাধের জন্য য়ে দায়ী নয় তা পুনর্ব্যক্ত করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর চালানো এই নৃশংসতাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো।

Translate