শনিবার ২৩শে মে, ২০২৬

মসলায় রাজস্ব কমলো ১০০ কোটি টাকা

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে মসলা আমদানিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটায় সরকারের রাজস্ব আদায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমে গেছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৭৮ শতাংশ কম।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে মসলা আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬২ হাজার মেট্রিক টন। এজন্য রাজস্ব আদায় কমেছে।

আমদানিকারকরা বলছেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে প্রচুর মসলা দেশের বাজারে প্রবেশ করছে। অবৈধভাবে আসা পণ্যে কোনও ট্যাক্স বা শুল্ক দিতে হয় না। ফলে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

তবে এবার কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এখন পর্যন্ত মসলার বাজার স্থিতিশীল আছে। সাধারণত এ সময়ে চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়ার প্রবণতা থাকলেও এবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মসলার দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম, আবার কিছু স্থিতিশীল। তবে পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে দামে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাচ, লবঙ্গ ও দারুচিনিসহ বেশ কিছু মসলার দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। যেমন সাদা এলাচ পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে কমে চার হাজারে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দারুচিনি ও লবঙ্গের দামও অনেকটা কমেছে। জিরার সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে দামে কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। তবে পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা পর্যায়ে কেজিতে ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে। সবমিলিয়ে পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুতের কারণে এবার দাম বাড়ার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

মসলা আমদানি কমেছে

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার মসলা আমদানি কমেছে। তবু বাজারে সংকট নেই। আছে পর্যাপ্ত মজুত। স্বাভাবিক আছে সরবরাহ। ফলে ঈদুল আজহা সামনে রেখে এবার দেশে মসলার কোনও সংকট হবে না। এমনকি দাম বাড়ারও শঙ্কাও নেই।

আমদানিকারকরা বলছেন, বৈশ্বিক উত্তেজনা ও যুদ্ধজনিত পরিস্থিতি বিরাজ করলেও মসলা সরবরাহ ঠিক আছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত মসলা আমদানি করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যমান মজুত ঠিক আছে। তবে খুচরা বাজারের দাম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের তুলনায় অনেক বেশি।

আমদানি কমায় রাজস্বও কমেছে

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫-এর ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দারুচিনি আমদানি হয়েছে ১০ হাজার ৬১১ মেট্রিট টন। যেখান থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। একই বছর এক লাখ ৩৫ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন রসুন আমদানি বাবদ সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এক হাজার ৮৯৩ মেট্রিক টন এলাচ আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তিন হাজার ৯৩৮ মেট্রিক টন জিরা থেকে রাজস্ব এসেছে ৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। দুই হাজার ১৮০ মেট্রিক টন লবঙ্গ আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৭ কোটি টাকা। এক হাজার ১৬৯ মেট্রিক টন গোলমরিচ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ৩৮ হাজার ৫৪৭ মেট্রিক টন আদা থেকে রাজস্ব এসেছে ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ৩০৪ মেট্রিক টন জয়ত্রী থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ছয় কোটি ১৩ লাখ টাকা। ১৬ হাজার ৬১০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ থেকে রাজস্ব এসেছে পাঁচ কোটি ৮১ লাখ টাকা। চার হাজার ৭৭৮ মেট্রিক টন হলুদ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে চার কোটি ২১ লাখ টাকা। ৩৩২ মেট্রিক টন জায়ফল থেকে রাজস্ব এসেছে এক কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ১২৫ মেট্রিক টন মরিচ থেকে রাজস্ব আসে ৪৩ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬-এর ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত মসলা আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১২ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন দারুচিনি আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৪৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ৬৯ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন রসুন আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪০ কোটি নয় লাখ টাকা। এক হাজার ৯৮ মেট্রিক টন এলাচ আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয় ৭২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। দুই হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন জিরা আমদানি থেকে রাজস্ব এসেছে ৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এক হাজার ২৫৭ মেট্রিক টন লবঙ্গ আমদানি থেকে রাজস্ব আসে ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। দুই হাজার ৩২১ মেট্রিক টন গোলমরিচ আমদানি থেকে রাজস্ব এসেছে ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ৬২ হাজার ৩৯৪ মেট্রিক টন আদা আমদানি থেকে রাজস্ব আদায় হয় ৩৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ৩৪৫ মেট্রিক টন জয়ত্রী আমদানি থেকে রাজস্ব আসে সাত কোটি ১১ লাখ টাকা। ৭৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি থেকে রাজস্ব আসে তিন লাখ টাকা। ৭৫৩ মেট্রিক টন হলুদ আমদানি থেকে রাজস্ব আসে ছয় কোটি ৮২ লাখ টাকা। ৩৪৬ মেট্রিক টন জায়ফল আমদানি থেকে রাজস্ব আসে এক কোটি ১৭ লাখ টাকা ও ৮৬ মেট্রিক টন মরিচ আমদানি থেকে রাজস্ব আসে ৩৩ লাখ টাকা।

আমদানি কমেছে যেসব পণ্যের 

গত বছরের আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আগের বছর রসুন আমদানি হয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন। চলতি বছর আমদানি হয়েছে ৬৯ হাজার ৫৫৯ মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় আমদানি কমেছে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের বছর এলাচ আমদানি হয়েছে এক হাজার ৮৯৩ মেট্রিক টন। এবার হয়েছে এক হাজার ৯৮ মেট্রিক টন। আমদানি কমেছে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। গত বছর জিরা আমদানি হয়েছিল তিন হাজার ৯৩৮ মেট্রিক টন। এবার তা কমে আমদানি হয় দুই হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন। এবার আমদানি কমেছে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। গত বছর লবঙ্গ আমদানি হয়েছিল দুই হাজার ১৮০ মেট্রিক টন। এবার হয়েছে এক হাজার ২৫৭ মেট্রিক টন। আমদানি কমেছে ৪১ দশমিক ২ শতাংশ। গত বছর পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল ১৬ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন। আগের বছর মরিচ আমদানি হয় ১২৫ মেট্রিক টন। এবার আমদানি হয় ৮৬ মেট্রিক টন। আমদানি কমেছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বছর ১০-১২ শতাংশ আমদানি বাড়ে। গত বছর যে পরিমাণ মসলার চাহিদা ছিল এ বছর তার চেয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বেশি বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু আমদানি দেখলে বোঝা যায় তা আগের চাহিদার চেয়ে কমেছে। আমদানি কমেছে ৬২ হাজার টন।

খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমদানি কমলেও বাজারে মসলার সংকট নেই। কোনও কোনও মসলার আমদানি গত বছরের তুলনায় এবার কমেছে। দামও কমেছে। সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় অবৈধপথে মসলা আসছে। এক কেজি জিরা বৈধভাবে আমদানি করলে সরকারকে রাজস্ব দিতে হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। এককেজি এলাচে শুল্ক দিতে হয় এক হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু যারা চোরাই পথে আনছে তাদের বর্ডার খরচ দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। অবৈধপথে মসলা আসায় সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।’

যা বলছে কাস্টমস

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১২ ধরনের মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১২ ক্যাটাগরির মসলা মিলে আমদানি হয়েছিল দুই লাখ ১৫ হাজার ৫৪৫ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয় এক লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ দশমিক ৫ টন। গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৫৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এবার রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৫৭ কোটি সাত লাখ টাকা। প্রায় ৯৯ কোটি টাকা কমে এসেছে। শতাংশের হিসাবে ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কম মসলা আমদানি হয়েছে এবার।’

Translate