ঢাকার ফুটবলে অন্যতম এক শক্তির নাম রহমতগঞ্জ। এক সময় ফুটবলে দুর্দান্তসব অর্জন ছিল রহমতগঞ্জের। মাঝে কিছুটা সময় নিষ্প্রভ থাকলেও ফের স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়েছে পুরানো ঢাকার এই ক্লাবটি।
সম্প্রতি বেশ কিছু বছর ধরেই ঢাকার মাঠের পেশাদার লিগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনী লিমিটেড, কিংস এবং মোহামেডনের মতো বড় দলগুলোকে হারিয়ে ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাতি অর্জন করেছে।
২০০৭ সালে প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ আসর থেকেই খেলে যাচ্ছে রহমতগঞ্জ। ২০১৩ সালে একবার পেশাদার লিগের দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে নেমে গেলেও পরের বছরেই ফিরে আসে ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর পেশাদার লিগে। তবে পেশাদার লিগে শিরোপা বা রানার্সআপ ট্রফি জিততে না পারলেও ২০১৯-২০ ও ২০২১-২২ মৌসুমে ফেডারেশন কাপের দুটি রানার্সআপ ট্রফি শোভা পাচ্ছে পুরনো ঢাকার ক্লাবটির শোকেসে।
সাম্প্রতিক সময়ে পেশাদার ফুটবল লিগের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ ফুটবল লিগেও দারুন পারফরম্যান্স দেখিয়েছে রহমতগঞ্জ। গত মৌসুমে ১৮টি ম্যাচ খেলে নয় জয়, তিন ড্র ও ছয় হারে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের চতুর্থস্থানে থেকে শেষ করেছিল পুরান ঢাকার ক্লাবটি।

যেখানে ৪২ পয়েন্ট নিয়ে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন, ৩৫ পয়েন্ট নিয়ে ঢাকা আবাহনী রানার্সআপ এবং ৩২ পয়েন্ট নিয়ে কিংস তৃতীয় হয়েছিল। তাদের ঘানার ফরোয়ার্ড স্যামুয়েল বোয়েটেং ২১ গোল করে সর্বাধিক গোলদার পুরস্কারও জিতেছিল। চলমান পেশাদার লিগেও চমক দেখিয়ে চলেছে তারা। ১-১ গোলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানকে রুখে দিয়েছে। ৩-২ গোলে হারিয়েছে ব্রাদার্স ইউনিয়নকে। ১১ ম্যাচ খেলে পাঁচ জয় এবং তিনটি করে ম্যাচে ড্র ও হার নিয়ে ১৮ পয়েন্টে টেবিলের চতুর্থ স্থানে রয়েছে রহমতগঞ্জ।
ক্লাবের এমন উত্তরণের নেপথ্য নায়ক বর্তমান সভাপতি হাজী মো. টিপু সুলতান। ২০০৬-২০১৩ পর্যন্ত রহমতগঞ্জ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন। মূলত ওই সময়েই রহমতগঞ্জ জায়ান্ট কিলার নামে আখ্যায়িত হয়েছিল। গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে তিনি ক্লাবটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই মৌসুমে রহমতগঞ্জ ক্লাব লীগের ৪র্থ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয় যা ক্লাবের রেকর্ড নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। চলতি মৌসুমে ২০২৫-২৬ এ লীগের চতুর্থ স্থানে থেকে চ্যম্পিয়ন রেসে টিকে রয়েছে ক্লাবটি।
হাজী মো. টিপু সুলতান বলেন, ‘আমাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যই হচ্ছে শতবর্ষী ক্লাব রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি ক্লাব। এর মাধ্যমে ঢাকার মাঠে আমাদের পরিচিতি বেড়েছে। আমাদের ঐতিহ্য আর সংগ্রাম এলাকার এই ক্লাবটিকে ঘিরেই। তাই আমরা প্রতি বছর চেষ্টা করি ঐতিহ্য ধরে রেখে ক্লাবটিকে পেশাদার লিগের শিরোপা লড়াইয়ে রাখার। এতে এলাকার মানুষের ভালোবাসাও প্রতিফলিত হয়।’

রহমতগঞ্জ এমএফএসের ইতিহাস
পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ এলাকার লোকজনের উদ্যোগে মূলত ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৩ সালে। তখন নাম ছিল ‘রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি’ (রহমতগঞ্জ এমএফএস)। রহমতগঞ্জ শুধু একটি ক্লাব নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষের আবেগ। মোহামেডান বা আবাহনীর মতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু না হলেও, রহমতগঞ্জ ক্লাব নিয়ে স্থানীয়দের গর্বের শেষ নেই। প্রতি ম্যাচে মাঠে বসে থাকা পুরান ঢাকার দর্শকদের চিৎকার প্রমাণ করে- এই ক্লাব এখনো জীবিত, এখনো প্রাসঙ্গিক।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে পুরান ঢাকায় রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম সাহেব ছিলেন পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ইমামগঞ্জের আলাউদ্দিন, মো. আজম, আহমদ হোসেন, মো. সাদেক এবং আবু সাঈদ। আবদুস সোবহান এবং মো. কাশেম যথাক্রমে ক্লাবের প্রথম সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মূলত ক্লাবটি একটি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতো, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি খেলাধুলায় জড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ক্লাবটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ শুরু করে, এলাকার তরুণদের নিয়ে একটি দল গঠন করে।
১৯৫০ সালে, মো. কাশেম, তৎকালীন ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক খাজা আজমল সাহেবের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন এবং দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ফি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৩ সালে, সভাপতি মো. আরেফ মিয়া সরদার এবং সাধারণ সম্পাদক এম এ আউয়ালের নেতৃত্বে, ক্লাবটি তৃতীয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়।

১৯৬৪ সালে ঢাকা হলের জাহাঙ্গীর ফয়েজের সহায়তায় ক্লাবটি একটি দল গঠন করে, যার মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এমএম শরীফ, রমজান আলী, মন্টু আবজান খান, আব্দুল আজিজ এবং অধিনায়ক বাহারউদ্দিন। দলটি দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন হয় এবং প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়।
১৯৬৫ সালে ক্লাবটি কিউএম রফিক দিপুর নেতৃত্বে প্রথম বিভাগে প্রবেশ করে। ক্লাবটি প্রথম বিভাগে তাদের প্রথম মৌসুম দশম স্থানে শেষ করে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন মৌসুম ধরে ধারাবাহিকভাবে পঞ্চম স্থানে ছিল। এই সময়ে ক্লাবের হয়ে খেলা উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন সুলতান আহমেদ, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, গোলাম সারওয়ার টিপু, মঞ্জুর মুর্শিদ গাউস, শাজাহান আলম এবং স্কুটার গফুর।
১৯৬৬ সালে শাজাহান আলমের নেতৃত্বে ক্লাবটি প্রথম আগা খান গোল্ড কাপে অংশগ্রহণ করে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন ক্লাবটি পশ্চিম পাকিস্তান সরকারি প্রেসকে পরাজিত করে কিন্তু সিলনের কাছে পরাজিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের টুর্নামেন্টের রাউন্ড-রবিন লীগে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ক্লাবটি জগন্নাথ কলেজের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নূর হোসেনের কোচিংয়ে ছিল। ১৯৭৩ সালে রহমতগঞ্জ ভারতের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত বোরদোলোই ট্রফিতে অংশগ্রহণ করে। দলে ক্লাব অধিনায়ক সুলতান আহমেদ এবং বিভিন্ন স্থানীয় ক্লাবের অতিথি খেলোয়াড় ছিলেন- নওশেরুজ্জামান, শরীফুজ্জামান, এনায়েতুর রহমান এবং জাকারিয়া পিন্টু।
১৯৭৩ মৌসুমে ক্লাবটি তৃতীয় স্থান অর্জন করে, যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুম ছিল। ১৯৭৭ সালে ক্লাবটি তার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মৌসুমগুলির মধ্যে একটি উপভোগ করে, লিগ এবং লিবারেশন কাপ উভয় ক্ষেত্রেই ঢাকা আবাহনীর পরে রানার্সআপ হয়ে শেষ করে। লিগের শিরোপা নির্ধারণী খেলার প্রথম লেগে, রহমতগঞ্জ আবাহনীর সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে।