গত ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘটের পাগলপাড়া এলাকায় তল্লাশি চৌকিতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য কর্মরত ছিলেন। রাত ৩টার দিকে সেখানে একটি মোটরসাইকেল থামায় পুলিশ সদস্যরা। ওই মোটরসাইকেলে থাকা এক যুবকের নাম লিয়ন (২৮)। তিনি হালুয়াঘাট উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রুহুল আমিনের ছেলে। কেন মোটরসাইকেল থামানো হলে নিয়ে পুলিশের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি। বাগবিতণ্ডায়ও জড়ান এই যুবক। ঘটনাস্থলের পাশেই লিয়নদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবার কাছে বিষয়টি জানান পুলিশ সদস্যরা। সেখান থেকে ফেরার পথে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালান লিয়ন। ইজাউল হক ভূঁইয়া (৪৩) নামে এক পুলিশ সদস্যের পিঠে দা দিয়ে কোপ দেন লিয়ন। পরে পুলিশ সদস্যকে গুরুত্বর অবস্থায় প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করে। এই হামলার একদিন পরই অভিযুক্তকে আটক করা হয়।
গত ১৮ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার থানাধীন ১ নম্বর বাংলাবাজার ইউনিয়নের মৌলারপাড় এলাকায় একদল দুষ্কৃতকারী পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা পুলিশের ন্যায়সঙ্গত সরকারি কাজে বাঁধা প্রদান এবং হত্যার উদ্দেশে মব তৈরি করে আক্রমণ চালিয়ে জখম করে। হামলার একপর্যায়ে দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের ব্যবহৃত দু’টি মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জের ঘটনার একদিন আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলার হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মব তৈরি করে পুলিশের দুই সদস্যের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে ওই দু’জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এর আগে গত ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের হাটহাজারী মডেল থানায় ঢুকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গত ৫ অক্টোবর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চত্বর এলাকায় পুলিশরে ওপর হামলা করা হয়।
শুধু উল্লেখিত এসব ঘটনা নয়, প্রায়শ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলার মুখে পড়ছেন। এতে করে প্রশ্ন উঠছে, জনগণের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুরক্ষা নিয়ে। নিজেরা অসুরক্ষিত থেকে কীভাবে জনগণকে সুরক্ষা দেবে তারা।
পুলিশের হিসেব অনুযায়ী, অভিযানে গিয়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দু’জন করে পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা এক ধরণের অশনি সংকেত।
পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরে সারাদেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ৬০১টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে গত বছরের মার্চে। মাসটিতে ৯৬ পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া জানুয়ারিতে ৩৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি, এপ্রিলে ৫২টি, মে মাসে ৬২টি ও জুনে ৪৪টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া জুলাইয়ে ৩৯টি, আগষ্টে ৫১টি, সেপ্টেম্বরে ৪৩টি, অক্টোবরে ৬৯টি, নভেম্বরে ৪১টি এবং ডিসেম্বর মাসে ২৯টি পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। দৈনিক গড় হিসেব করলে প্রতিদিন এক দশকি ছয়জন করে পুলিশ সদস্য অভিযান চালাতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন।
ছয় বছর আগেও বছরে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ছিল সাড়ে চারশ’র ঘরে। ২০২০ সালে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ৪৪৯টি। পরের বছর এই সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৬০৮টিতে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ৬০১টিতে আসে। ২০২৩ সালে সারাদেশে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে ৬০৭টি। ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। বছরটিতে ৬৪৩ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দেশে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যায় নিয়ে মাঠে নামে পুলিশ। পরিবর্তন আনা হয় পোশাকেও। এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান হয়নি। উল্টো খুন, অপহরণ এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনা দৈনন্দিন অপরাধের রূপ নিয়েছে।
মব তৈরি করে লুটপাট, দখলের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এখানে পুলিশের যে ধরণের ভূমিকা নেওয়া দারকার তা নিতে দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি সঙ্গবদ্ধ হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। সাধারণ মানুষতো দূরের কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বিশেষ করে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের সবটা এখনও উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশের মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা করছে সন্ত্রাসীরা।
হামলার ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “সম্প্রতি হামলার ঘটনা ছাড়াও পুলিশের ওপর আক্রমনের ঘটনা গত একবছরে অসংখ্যবার ঘটেছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর সদস্যরা যেকোনো প্রেক্ষাপটে যখন আইনের প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছেন, তখনই এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাউকে মামলার আসামি করার ক্ষেত্রে পুলিশকে বাধ্য করা হয়েছে। একইভাবে এজাহার থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। থানা থেকে আসামিও ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। নতুন বাস্তবতায় নতুন সক্ষমতার বিকাশ বা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে ধরণের সহযোগিতা এবং ব্যবস্থার প্রয়োজন সেটা পুলিশ পাচ্ছে না। উল্টো তাদেরকে দোষারপ করা হচ্ছে। তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সুবিধা নেওয়ার মতো উদাহরণ কিন্তু অসংখ্য।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশ যখনই কারো অন্যায় আবদারে সাড়া দেয়নি, তখনই পুলিশের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এটা পুলিশের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে ছিলেন বা আছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের ওপর হামলা করেছেন। অভিযানে গিয়েও হামলার শিকার হচ্ছেন আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর সদস্যরা। এতে করে পুলিশের মধ্যে নৈতিকভাবে ঘুড়ে দাঁড়ানোর প্রশ্নে নানা ধরণের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। যারাই এ ধরণের হামলা করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা না পারলে দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না।”
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “হামলার ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী যদি জোরালো ব্যবস্থা নিতে পারতো তাহলে এই অবস্থার পরিবর্তন হতো। এই অবস্থার পরিবর্তনে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনও বিকল্প নেই। কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সকল অপরাধীদের কাছে ‘অপরাধী যেই হোক, কোনও ছাড় নয়’ এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তাহলেই এই অবস্থা থেকে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী পরিত্রাণ পাবে।”
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপরেও যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আক্রান্ত করছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”