ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের এক ‘নগ্ন’ হস্তক্ষেপে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে আসন্ন উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া থেকে রুখে দিয়েছে দলের ন্যাশনাল এগজিকিউটিভ কমিটি (এনইসি)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে স্টারমারের ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া ও ‘নির্লজ্জ’ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
শনিবার ও রবিবারের ছুটিতে এই নাটকীয় সিদ্ধান্তে উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গন। স্টারমার-নিয়ন্ত্রিত এনইসি ৮-১ ভোটে বার্নহামকে গর্টন ও ডেন্টন উপ-নির্বাচনে লড়ার অনুমতি দেয়নি। দলের পক্ষ থেকে মেয়র নির্বাচনের খরচ ও অন্য দলের হুমকির দোহাই দেওয়া হলেও, দলের ভেতরেই সমালোচনা উঠেছে যে স্টারমার আসলে তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে পার্লামেন্ট থেকে দূরে রাখতেই এই কৌশল নিয়েছেন।
কিয়ার স্টারমার কার্যকরভাবে পার্লামেন্টের দরজা এমন এক ব্যক্তির জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন, যিনি সরাসরি তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা রাখেন। সমালোচকদের মতে, এটি কেবল নিয়ম রক্ষা নয়; বরং স্টারমারের গভীর নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার এই ‘লোভ’ তার নৈতিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ রাজনীতিতে টনি ব্লেয়ার বা মার্গারেট থ্যাচারকেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু দলীয় আমলাতন্ত্র ব্যবহার করে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীকে শারীরিকভাবে পার্লামেন্টে ঢুকতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ব্রিটিশ ইতিহাসে বিরল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্টারমার রাজনীতিকে এখন একটি আদালত কক্ষের মতো দেখছেন, যেখানে প্রতিপক্ষকে যুক্তিতে নয় বরং আইনি বা পদ্ধতিগত প্যাঁচে ফেলে চুপ করিয়ে দেওয়াটাই তার লক্ষ্য।
এনইসি-র এই সিদ্ধান্তে দলীয় কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মতে, স্টারমার হয়তো সাময়িকভাবে বার্নহামকে ‘আঞ্চলিক বনবাসে’ রাখতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তিনি নিজে ঝুঁকিতে রয়েছেন। তিনি এমন নেতায় পরিণত হতে পারেন যার ক্ষমতা আছে কিন্তু কোনও নৈতিক শক্তি নেই।
বলা হচ্ছে, জেরেমি করবিনের আদর্শকে যেভাবে তিনি নিখুঁত সার্জিক্যাল দক্ষতায় দল থেকে সরিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে এখন অ্যান্ডি বার্নহামের মতো জনপ্রিয় নেতাকে তিনি ‘নিষিদ্ধ’ করছেন। এর মাধ্যমে বার্নহাম সাধারণ কর্মী ও নরমপন্থিদের কাছে একজন ‘নির্বাসিত রাজপুত্রে’ পরিণত হয়েছেন, যা ভবিষ্যতে স্টারমারের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে।
অ্যান্ডি বার্নহাম সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে আবেগীয় সংযোগ স্থাপন করতে পারেন, স্টারমারের চরিত্রে সেটির অভাব স্পষ্ট। প্রেরণা দেওয়ার চেয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেই তিনি বেশি আগ্রহী। ডাউনিং স্ট্রিট হয়তো আপাতত বার্নহামের উপদ্রব ঠেকাতে পেরেছে, কিন্তু দলের ভেতর যে ফাটল ও অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসা স্টারমারকে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে বাধ্য করবে।