জীবনে উত্থান-পতন থাকেই। তবে সাবিনা খাতুনের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে এর চেয়ে বেশি কিছু মনে হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ বলে অভিহিত সাফ ফুটবলে টানা দুবার (২০২২ ও ২০২৪ সালে) শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। দুবারই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে শেষবার শিরোপা জিতিয়ে কঠিন টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে যান। দেশে ফিরে কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ছিটকে যান লাল-সবুজ দল থেকে। ক্যারিয়ারই যখন অনিশ্চিত, তখন ফুটসালে নতুন করে আলোর রেখা দেখতে পেলেন সাবিনা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল এখানেও। স্বভাবসুলভ নেতৃত্বের পাশাপাশি নৈপুণ্য দেখিয়ে ব্যাংককে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন সাফ ফুটসালের প্রথম শিরোপা। যেখানে তার হাত ধরে আরও একবার ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।
অথচ সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলবেন কিনা তা ঘুণাক্ষরেও সাবিনা আন্দাজ করতে পারেননি। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের আগে ও পরে বিদ্রোহ করেছেন। এরপর তো ছিটকে পড়া। মনে হচ্ছিল ক্যারিয়ারের বুঝি ইতি এখানেই! কিন্তু কঠিন মনোবল এবং পরিশ্রম সাবিনাকে পেছনে ফেলতে পারেনি। বাফুফে ভবনে থেকে অন্যরা যখন অনুশীলনে যায়, তাকে সময় কাটাতে হয়েছে শুয়ে-বসে। দিনের পর দিন কঠিন সময় কেটেছে। এমনকি বাফুফের সঙ্গে চুক্তি হবে কিনা সেটাও ছিল অজানা।
শুধু সাবিনা নন, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণা রানী, নীলুফার ইয়াসমিন নীলারাও একই পথের পথিক ছিলেন। ঠিক এই অবস্থায় জাতীয় দলে থাকতে না পেরে ভুটান লিগে পাড়ি জমান তারা। সেখানে খেলেও মানসিক শান্তি পাননি। সেখানকার লিগের দুর্বল কাঠামো নিয়ে পিটার বাটলারের কটু কথা দূরে থেকেও শুনতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরলেও কোনোভাবে আর বাটলারের দলে জায়গা হয়নি। নতুন করে চুক্তির পর আবার বাফুফে তাদের কোথায় খেলাবে তাও পরিষ্কার করতে পারেনি। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে মাসুরাসহ অন্যদের।
সাবিনার হাতে ট্রফি সহ পুরো দলের উদযাপন।
সাবিনা যদিও এসময় একদম চুপচাপ থাকাকে মন্ত্র হিসেবে বেছে নেন। সেই যে বিদ্রোহ হলো- একপর্যায়ে এসে কোনও নেতিবাচক কথা তো দূরের কথা, মুখে যেন কুলুপ এঁটে রইলেন। তারপর সাফ ফুটসাল যেন লাইফ লাইন হয়ে এলো। সেখানেও তাকে নানান তির্যক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। কেউ কেউ তো অবসর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সাবিনা শক্ত হাতে তা সামাল দিয়েছেন। ৩২ বছর বয়সে নিজের সিদ্ধান্তটা নিজেই নিতে চান বলে সরাসরি বলে দিয়েছিলেন তিনি।
ব্যাংককে গিয়ে তো জবাবটা মাঠেই দেওয়া শুরু করলেন। শুধু গোল করা নয়, করানোতেও বড় ভূমিকা রাখলেন। ১৪টি গোল করে টুর্নামেন্ট সর্বোচ্চ তালিকায় নাম উঠিয়েছেন সাবিনা। দলের প্রয়োজনে রক্ষণে এসেও খেলছেন। নিচ থেকে খেলা তৈরি করে দারুণ নেতৃত্ব দিয়েছেন একদম যোগ্য নেতার মতোই। তাই তো মাসুরা-নীলাদের পাশাপাশি নতুন ঝিলি-লিপিসহ অন্যদের সঙ্গে রসায়ন তৈরিতে সময় লাগেনি। একটি দল হয়ে কীভাবে খেলতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন।
সাবিনার কাছে বয়স শুধুই সংখ্যা। অন্তত ব্যাংককের পারফরম্যান্স দেখে এখন কেউ আর অবসরের কথা মগজে আনবে না। নারী ফুটবলে ২০২২ ও ২০২৪ সালের দুটি সাফের শিরোপা সাবিনার হাত ধরে। ২০২৬ জানুয়ারিতে এসে বাংলাদেশকে ফুটসালের শিরোপা পাইয়ে দিয়ে সাবিনা যেন অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি জয়ের হ্যাটট্রিক গড়লেন! পারফরম্যান্সই যে শেষ কথা তা আবার বুঝিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু এত কিছুর পরও আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে দেশের নারী ফুটবলের অনন্য এই তারকার! এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলবে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। যেখানে ঠাঁই হয়নি সাবিনা-মাসুরাদের। অস্ট্রেলিয়ার এই আসরে না থাকার কষ্টটা গোপন করেই নিজেকে আবারও প্রমাণ করেছেন তিনি। ‘যোদ্ধা’ সাবিনা আবার দেখিয়েছেন, দেশকে এখনও অনেক কিছু দেওয়ার আছে।