বুধবার ২০শে মে, ২০২৬

ইরানে বাঘের গালিবাফ কি ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র

বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ সম্মেলন শেষ হওয়ার ঠিক দুই দিন পর, শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ করে। খবরে জানানো হয়, মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে তার বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার পদের পাশাপাশি ‘চীন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত হোক বা কাকতালীয়, এই নিয়োগের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এত দিন এই পদটি ছিল প্রয়াত আলি লারিজানির হাতে, যিনি ২০২১ সালে চীনের সঙ্গে ইরানের ২৫ বছর মেয়াদি সহযোগিতা চুক্তিটি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু গত মার্চ মাসে এক হামলায় লারিজানি নিহত হন। যেকোনও বিষয়ে লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হওয়া ইরানে কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। কিন্তু একই সঙ্গে পার্লামেন্ট পরিচালনা করা এবং কিছুদিন আগেই ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার পর, এখন আবার এই নতুন দায়িত্ব পাওয়া, সব মিলিয়ে গালিবাফের হাতে ক্ষমতার এমন এক কেন্দ্রীভবন ঘটছে, যা ইরানি রাজনীতি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

গালিবাফের উত্থান

পশ্চিমা বিশ্লেষকরা গালিবাফকে ঠিক কোন অবস্থানে রাখবেন, তা নিয়ে সব সময়ই দ্বিধায় ছিলেন। তার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর অতীত এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিই কেবল তাদের আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু দুটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তিনি কীভাবে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান তৈরি করেছেন এবং তার এই একের পর এক দায়িত্ব লাভ, আয়াতুল্লাহ খামেনি পরবর্তী ইরানের আসল ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়, তা প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

গালিবাফের এই উত্থান হঠাৎ করে হয়নি। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালীন তিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডার হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অগ্রাধিকারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে সামলানো এবং সামরিক বাহিনী যখন যুদ্ধ করছে তখন পার্লামেন্টকে সচল রাখার দক্ষতার কারণে তিনি বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। খামেনির যখন এমন একজন মানুষের প্রয়োজন ছিল যিনি একই সঙ্গে কমান্ডার, আইনপ্রণেতা, কূটনীতিক এবং জনগণের সঙ্গে নির্ভরযোগ্যভাবে কথা বলতে পারবেন, তখন গালিবাফই ছিলেন একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।

ইরানি কাঠামোতে অবস্থান

ইরান আংশিকভাবে হলেও প্রাদেশিক পৃষ্ঠপোষকতা নেটওয়ার্ক, পারিবারিক সম্পর্ক, ঠিকাদারদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং শহরজুড়ে সামাজিক জীবন পরিচালনাকারী ‘হেয়াত’ (শোক প্রকাশকারী সংগঠন) নামক ব্যবস্থার ওপর টিকে আছে। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতাসীন দল বিলুপ্ত করার পর এই কাঠামোর উদ্ভব হয়, যা পরে আর কোনও দল দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়নি। ফলে ইরানের পার্লামেন্ট সদস্যরা দলীয় শৃঙ্খলার চেয়ে স্থানীয় কোয়ালিশনে নিয়োগ, সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পদ সরবরাহের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখেন। আর পার্লামেন্টের স্পিকারের পদটি হলো সেই জায়গা, যেখানে এই প্রাদেশিক সার্কিটগুলো কেন্দ্রের সঙ্গে মিলিত হয়। এটি পরিচালনা করার জন্য পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা ও মধ্যস্থতার যে দক্ষতা প্রয়োজন, তা অনেক সামরিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নেই। তেহরানের মেয়র হিসেবে ১২ বছর দায়িত্ব পালনের সময়ই গালিবাফ এই দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট সংঘাত গালিবাফের এই যাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই এই ব্যবস্থার অন্যতম দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব; স্বয়ং খামেনি এবং লারিজানি চিরতরে হারিয়ে যান। এরপর থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মূলত বিভিন্ন বিবৃতি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই যোগাযোগ রাখছেন, এবং তার শারীরিক অবস্থা এখনও অনিশ্চিত। এমন দূরত্বে থেকে একজন সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে এই শাসনব্যবস্থাকে সেভাবে সমন্বয় করা সম্ভব নয়, যেভাবে তার পূর্বসূরি তিন দশক ধরে করেছিলেন। আর এই সমন্বয়কের ভূমিকাটিই এখন ক্রমশ অন্যদের ওপর বর্তাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোর পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, গালিবাফই এখন সেই দায়িত্বের বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

ইরানে স্পিকারদের ভূমিকা

এখানে একটি ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক প্যাটার্ন বা ধারাও লক্ষ করা যায়। ইরানের রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রেসিডেন্সি এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকারের লড়াইয়ের ওপর বেশি নজর দেওয়া হয়, আর স্পিকারের পদটিকে ভাবা হয় গৌণ। তবে ঐতিহাসিকভাবে, ইরানের স্পিকাররা প্রায়শই প্রেসিডেন্টদের চেয়ে ভালো অবস্থানে থেকেছেন। প্রেসিডেন্টরা দায়িত্ব ছাড়ার পর অনেক সময় প্রান্তিক হয়ে পড়েন, কারণ নির্বাহী ক্ষমতা তাদের এই ব্যবস্থার মূল কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায়। অন্যদিকে, স্পিকাররা সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে এমন রাজনৈতিক পুঁজি অর্জন করেন যা ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, কোনও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে না। আকবর হাশেমি রাফসানজানি স্পিকার থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। লারিজানি এই পদটিকে ব্যাপক কূটনৈতিক প্রভাবের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আলী আকবর নাতেঘ-নূরী পার্লামেন্ট ছেড়ে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে যোগ দিয়ে দশকের পর দশক ধরে পরিদফতর পরিচালনা করেছিলেন। আজকের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অস্থিতিশীল হলেও গালিবাফের পথচলা সেই ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গেই মিলে যায়।

চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার নীতি সুদৃঢ় করা

গালিবাফের ব্যক্তিগত উত্থানের বাইরেও চীনের এই নিয়োগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ও চীন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে তাদের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করছে, যা ২০২১ সালের চুক্তির সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়ে বারবার বিবৃতি দিয়েছে। এমনকি ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার গ্যারান্টির মধ্যে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, বেইজিং তখন প্রকাশ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেনি। এগুলো কোনও কঠোরভাবে নিরপেক্ষ থাকা রাষ্ট্রের আচরণ নয়।

 

পূর্ববর্তী পর্বগুলোর মতো কোনও নিরপেক্ষ ইউরোপীয় রাজধানীর পরিবর্তে আলোচনার স্থান হিসেবে ইরান যে ইসলামাবাদকে বেছে নিয়েছে, তাও লক্ষ্যণীয়। পাকিস্তান এখানে প্রকৃত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে, তবে চীনের ওয়াং ই এই আলোচনা নিয়ে সরাসরি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং যুদ্ধের সময় ইসলামাবাদের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচ দফার শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন। বেইজিং পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে এমন একটি শহরে কূটনীতি পরিচালনা করা নিজেই ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান এখন কোন বহিরাগত কাঠামোকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করছে।

এই সম্পর্ক দেখভালের জন্য গালিবাফকে নিয়োগ দেওয়া একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। তিনি কোনও টেকনোক্র্যাট বা সাধারণ আমলা নন। দুটি যুদ্ধ জুড়েই তিনি ইরানের খণ্ড-বিখণ্ড প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে কাজ করার এবং রাজনৈতিক ফলাফল বয়ে আনার ক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে তাকে নিযুক্ত করা এটিই নির্দেশ করে যে, এই সম্পর্কটি বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী কার্যকর ব্যক্তিত্বের হাতে ন্যস্ত করার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান কি কৌশল পাল্টাচ্ছে

এটি কি সত্যিই পূর্বমুখী একটি কৌশলগত পরিবর্তন, নাকি বিকল্প পথ সংকুচিত হওয়ার ফল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পেছনে ইরানের স্পষ্ট কিছু স্বার্থ রয়েছে: বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা তেল বিক্রির বাজার, যা যুদ্ধের আগের চেয়ে এখন আরও বেশি জরুরি। তবে বেইজিংয়ের দিকে এই মোড় নেওয়াটা পছন্দের চেয়ে কৌশলগত বাধ্যবাধকতাও হতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাত পশ্চিমাদের সঙ্গে সমঝোতা করার ক্ষেত্রে তেহরানের পথ সংকুচিত করে দিয়েছে এবং অন্য সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলেই মূলত পূর্বের এই দরজাটি উন্মুক্ত হয়েছে।

ক্ষমতার ভরকেন্দ্র

তবে এই নিয়োগের ফলে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এই হিসাব-নিকাশগুলো আসলে কে করছেন। গালিবাফ কেবল ওপর থেকে আসা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন না। তার আইআরজিসির সঙ্গে অতীত সংশ্লিষ্টতার কারণে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে বিশ্বাস করে ঠিকই, তবে এতে কেন বারবার তার ওপরেই এমন সব দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে যার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, উপদলীয় মধ্যস্থতা এবং কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা প্রয়োজন, সেটির কোনও সদুত্তর দেয় না। এর উত্তর তার অতীতে নয়, বরং বর্তমানে তিনি কী করছেন তার মধ্যে নিহিত। দুই প্রভাবশালী নেতার মৃত্যু এবং সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া শূন্যতার মাঝে, কয়েক দশকের সমন্বয়কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই সাবেক মেয়রের মধ্যেই ইসলামিক রিপাবলিক যেন এখন এক কার্যকর ভরকেন্দ্র খুঁজে পেয়েছে।

সূত্র: আল-মনিটর

Translate