বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬

‘আসল’ তৃণমূলের চাবি ঋতব্রতের হাতে, মমতাকে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ হওয়ার প্রস্তাব

বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের এক মাসের মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্য রাজনীতিতে সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে আজ বুধবার তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন স্পিকার রথীন্দ্র বোস। একইসঙ্গে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার ঘরের চাবিও তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুগামী ফিরহাদ হাকিম কলকাতার মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ায় শাসক শিবিরের রক্তক্ষরণ এখন স্পষ্ট। দলের এমন নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে আজ সকালেই তৃণমূলের সমস্ত কমিটি এবং শাখা সংগঠন ‘অবিলম্বে’ ভেঙে দিয়ে আত্মবিশ্লেষণের পথে হাঁটার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে তাতে যে ড্যামেজ কন্ট্রোল করা যায়নি, তা স্পষ্ট হয়ে যায় বিকেলের দিকে।

দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আজ এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক নতুন ‘ভূমিকা’র কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিরোধী জোটের ‌‘প্রধান উপদেষ্টা’ হওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। ঋতব্রতের এই কৌশল মহারাষ্ট্রের এনসিপি ভাঙনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে অজিত পাওয়ার দল ভাঙলেও শরদ পাওয়ারের প্রতি মৌখিক আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নরম সুর রাখলেও, তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন ঋতব্রত। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পশ্চিমবঙ্গের অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের ক্ষেত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ভূমিকা বা সংযোগ নেই।

আজ সকালে ৫৯ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে দাবি করে বিধানসভায় হাজির হন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে সিংহভাগেরই সমর্থন তার দিকে রয়েছে দাবি করে স্পিকারের কাছে একটি চিঠি জমা দেন তিনি। সেখানে দাবি করা হয়, তাদের অংশটিই হলো ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেত্রী স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পুরো ঘটনাক্রম উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি ভাঙনের সেই চেনা মহারাষ্ট্রীয় চিত্রনাট্যকেই মনে করাচ্ছে। এদিকে এই আকস্মিক ভাঙনের নেপথ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

তৃণমূল নেতা মানব জয়সোয়াল সংবাদমাধ্যমকে জানান, কী ঘটছে তা রাজ্যের সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।

মূলত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলের অন্দরে এই তুমুল বিস্ফোরণ ঘটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী সন্দীপন সাহা দাবি করেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে জমা দেওয়া চিঠিতে বিধায়কদের সই জাল করা হয়েছে। এই জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তভার ইতোমধ্যেই রাজ্যের সিআইডি-র হাতে দেওয়া হয়েছে।

তবে বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলে কংগ্রেসের অন্দরে এই বিদ্রোহের মেঘ জমছিল। আরজি কর কাণ্ডের অব্যবস্থা এবং একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলছিলেন বহু বিধায়ক। গত সপ্তাহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা একটি বৈঠকেও এই বিক্ষুব্ধ নেতাদের অনেককে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি দেখা গেল আজ।

সূত্র: এনডিটিভি

Translate