ইন্টারনেটের যাত্রাপথে ঐতিহাসিক মাইলফলক—১৯৬৯ সালে ARPANET-এ প্রথম বার্তা প্রেরণ।

ইন্টারনেটের যাত্রাপথে ঐতিহাসিক মাইলফলক—১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর ARPANET-এ প্রথম বার্তা প্রেরণ করা হয়।

মাত্র দুটি অক্ষরের একটি বার্তা বদলে দিয়েছিল ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থার ইতিহাস।

আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট ছাড়া দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করাও কঠিন। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পাঠানো, ভিডিও কলে কথা বলা, তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা সংবাদ প্রকাশ—সবকিছুর পেছনে রয়েছে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ARPANET নামের একটি পরীক্ষামূলক কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দূরবর্তী দুটি কম্পিউটারের মধ্যে প্রথম বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।

ষাটের দশকে কম্পিউটার ছিল বিশাল আকারের, ব্যয়বহুল এবং প্রধানত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য তখনকার প্রযুক্তি ছিল সীমিত। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অর্থায়নে ARPANET প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে তথ্য ও কম্পিউটিং সম্পদ ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি করা।

১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাস (UCLA) থেকে স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সংযুক্ত একটি কম্পিউটারে বার্তা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞানী লিওনার্ড ক্লেইনরকের গবেষণাগারের শিক্ষার্থী ও প্রোগ্রামার চার্লি ক্লাইনের নেতৃত্বে এই প্রচেষ্টা পরিচালিত হয়। দূরবর্তী কম্পিউটারে ‘LOGIN’ শব্দটি পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রথমে ‘L’ ও ‘O’—এই দুটি অক্ষর পৌঁছানোর পরই গ্রহণকারী কম্পিউটারটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রথম বার্তাটি অসম্পূর্ণ থাকলেও প্রযুক্তির ইতিহাসে ঘটনাটি স্মরণীয় হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ত্রুটি সংশোধন করে সংযোগটি কার্যকর করা হয় এবং ARPANET ধীরে ধীরে আরও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কম্পিউটারগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের নতুন পদ্ধতি বিকশিত হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি, যোগাযোগের নিয়ম বা প্রোটোকল এবং TCP/IP-এর মতো ব্যবস্থার উন্নয়ন আধুনিক ইন্টারনেট গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত করে।

তবে ARPANET ও আজকের ইন্টারনেট এক বিষয় নয়। ARPANET ছিল ইন্টারনেটের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রদূত নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন স্বতন্ত্র কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্য দিয়েই পরবর্তী সময়ে আধুনিক ইন্টারনেটের বিকাশ ঘটে। তাই ১৯৬৯ সালের সেই পরীক্ষামূলক বার্তা প্রেরণকে ইন্টারনেটের ইতিহাসের একটি প্রতীকী সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আজ ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ব্যাংকিং থেকে ই-কমার্স—আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের অসংখ্য ক্ষেত্র এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ভুয়া তথ্যের বিস্তার ও ডিজিটাল বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবরের সেই অসম্পূর্ণ ‘LO’ বার্তা ছিল প্রযুক্তিগত দিক থেকে ছোট একটি ঘটনা, কিন্তু এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। দুটি কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের সেই প্রচেষ্টা পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। কয়েক দশকের ধারাবাহিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সেই যাত্রাই আজকের সংযুক্ত বিশ্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

Translate