সিসিচুইং।

জীবনের প্রথম কর্মস্থলের সেই পাহাড়ি উপত্যকায় ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘুরলে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মায়াবী মুখ যার নাম ছিল সিসিচুইং। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে এসে পাহাড়ি এই অঞ্চলে তাদের পরিবার বসতি স্থাপন করেছিল এবং ভিন্ন সংস্কৃতির হলেও পাহাড়ি মাটির সাথে সে বড্ড দ্রুত মিশে গিয়েছিল। সিসিচুইংকে ঘিরে জড়িয়ে আছে অনেক ছোটখাটো মধুর স্মৃতি যা মনের গহীনে আজও অমলিন হয়ে আছে। আমাদের অফিসটার বারান্দায় বসার একটা ছোট কাঠের টেবিল ছিল এবং বিকেলের দিকে যখন অফিসের কাজ শেষ হতো তখন সিসিচুইং ওর পিঠে ঝুড়ি ঝুলিয়ে সোজা আমার টেবিলে এসে হাজির হতো যেখানে হাতে থাকত ওর একটা বাঁধানো খাতা আর পুরনো একটা পেন্সিল। ওকে বাংলা বর্ণমালা শেখানোটা একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল কারণ ও যখন বলত যে স্যার আকাশ শব্দটা বললেই চোখের সামনে আপনাদের পাহাড়ের চেয়েও বড় কিছু ভেসে ওঠে তখন আমি অবাক হতাম এবং একদিন ওকে রবীন্দ্রনাথের একটা ছোট্ট লাইন বুঝিয়ে বলেছিলাম যে এবার ফিরাও মোরে লয়ে যাও প্রাঙ্গণে মোর। লাইনটার মানে শুনে ও অনেকক্ষণ চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পরে নিজের মতো করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেছিল যে আমাদের উপভাষায় এমন সুন্দর করে মেঘ বা নদীর কথা বলা যায় না। ও প্রতিদিন একটা করে নতুন বাংলা শব্দ শিখে সেটা একটা বাক্যে ব্যবহার করে আমাকে শোনাত এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল ও র এবং ল উচ্চারণ করতে গিয়ে অদ্ভুত এক মিষ্টি ভুল করত যা আজ ভাবলেও ঠোঁটে হাসি ফোটে। মাঝে মাঝে পড়ালেখার ফাঁকে ও মিয়ানমারের সেই দিনগুলোর গল্প বলত যে কেমন করে ছোটবেলায় নাফ নদী পার হয়ে বা পাহাড়ি ট্রেইল ধরে তাদের পরিবার এপারে এসে নতুন বসতি গড়েছিল এবং ওর চোখে তখন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা নেমে আসত। আমি তখন ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কবি নজরুলের সাম্য বা প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে কিছু সহজ পংক্তি পড়ে শোনাতাম আর ও মন দিয়ে শুনত যেন ওই কবিতার মাঝেই ও হারিয়ে যাওয়া শেকড় খুঁজে পাচ্ছে।

আমাদের কর্মস্থলের পাশেই ছিল একটা খরস্রোতা পাহাড়ি নদী যার ওপর স্থানীয়রা একটা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছিল এবং একবার প্রবল বর্ষণে পাহাড়ি ঢল নেমে নদীর পানি সাঁকো ছুঁইছুঁই করার সময় আমি ওপারে কাজে আটকে পড়লে সিসিচুইং নিচ থেকে সেটা দেখতে পেয়ে নিজের জুতো খুলে হাতে নিয়ে সোজা সাঁকো পার হয়ে আমার কাছে চলে এসে হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল যে সাহেব বাবু এভাবে ভয় পেলে পাহাড়ি নদীর সাথে লড়াই করা যায় না এবং আমার পা রাখুন আমার পায়ের পেছনে। ওর সেই অদম্য সাহস আর আত্মবিশ্বাস আমাকে সেদিন সত্যি অবাক করেছিল কারণ আমরা দুজনে মিলে বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটেছিলাম যেখানে মাথার ওপর ছিল শুধু একটা বড় কলাপাতা। আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল বিকেলবেলা যখন কাজ শেষে আমরা প্রায়ই পাশের একটা টিলার ওপর উঠে যেতাম যেটাকে আমরা নাম দিয়েছিলাম মেঘের খিলান। সেখান থেকে চারপাশের উপত্যকাটা পুরো দেখা যেত এবং সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে সাদা মেঘগুলো কেমন সুতার মতো জড়িয়ে থাকত যেখানে একদিন ও হঠাৎ একটা গাছের ডাল থেকে বেগুনি রঙের এক অপূর্ব বুনো অর্কিড পেরে আমার শার্টের পকেটে গুঁজে দিয়ে বলেছিল যে এটা আমাদের পাহাড়ের আশীর্বাদ আর এটা সাথে থাকলে আপনার কোনো বিপদ হবে না।

সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিটা ছিল বিদায়ের বেলাকার কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক বদলির কারণে মাত্র তিন দিনের নোটিশে যখন আমাকে পাহাড় ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছিল তখন সিসিচুইং সেদিন অফিসে আসেনি আর আমি ভেবেছিলাম হয়তো ও পাহাড়ের ওপাশে জুম ক্ষেতে গেছে। কিন্তু যখন আমি জিপ গাড়িতে ওঠার জন্য লাগেজ তুলছি ঠিক তখনই দেখি দূরে মেঠোপথ ধরে ও দৌড়ে আসছে এবং হাঁপাতে হাঁপাতে আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর সময় ওর দুচোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে আর ও কথা বলার মতো অবস্থায় না থেকে পকেট থেকে একটা ছোট্ট লাল সুতোয় বাঁধা কাঠের টুকরো বের করে আমার হাতে দিল যার ওপর ওর নিজের হাতে ভাঙা বাংলায় খোদাই করা ছিল ভালো থেকো। গাড়ি যখন পাহাড়ি রাস্তা ধরে নিচের দিকে নামতে শুরু করল তখন আমি পেছনের কাঁচ দিয়ে শেষবারের মতো দেখলাম সিসিচুইং একহাতে চোখ মুছছে আর অন্য হাত দিয়ে আমাকে বিদায়ের ইশারা করছে। সেই সবুজ পাহাড় সেই ঝরনার কুলকুল শব্দ আর সিসিচুইংয়ের নিষ্পাপ মুখটা আজও আমাদের প্রথম প্রেমের এক অমর কাব্য হয়ে মনে বেঁচে আছে।—— লেখক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

Translate