জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন ? ——গাজী মুহাম্মদ শাহজাহান।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সংগঠন জাতিসংঘের নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের দশম মহাসচিব হিসেবে নতুন একজন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত হয়নি।

বর্তমানে সাতজন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তাঁরা হলেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস বিরকেট, আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি, উগান্ডার ওলারাওতুন্নু, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা গার্সেস এবং ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি।

এর মধ্যে রেবেকা গ্রিনস্প্যান বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তৃতীয় গোপন ‘স্ট্র পোল’-এ তিনি ১৫ সদস্যের মধ্যে ৯টি ‘encourage’, ৫টি ‘discourage’ এবং ১টি ‘no opinion’ ভোট পান। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসা গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস বিরকেট পান ৮টি ‘encourage’, ৬টি ‘discourage’ এবং ১টি ‘no opinion’ ভোট। অর্থাৎ গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুবই সামান্য।

তবে এই ভোটকে চূড়ান্ত নির্বাচন হিসেবে দেখা যাবে না। ‘স্ট্র পোল’ মূলত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে কোন প্রার্থী কতটা গ্রহণযোগ্য—তার একটি অনানুষ্ঠানিক পরীক্ষা। চূড়ান্ত পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিষদকে একজন প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করতে হবে। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহাসচিবকে সাধারণ পরিষদ নিয়োগ দেয় নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য—এর কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে প্রার্থীকে সুপারিশ করা যাবে না। ফলে কোনো প্রার্থী স্ট্র পোলে এগিয়ে থাকলেই তিনি মহাসচিব হয়ে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

রেবেকা গ্রিনস্প্যানের প্রার্থিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কারণে। তিনি কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা UN Trade and Development-এর মহাসচিব। তাঁর নির্বাচনী দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বাস্তব ফলাফল অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ক্যারোলিন রড্রিগেস বিরকেটও প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তিনি ২০২০ সাল থেকে জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে গায়ানা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে, যার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও রয়েছে, কাজ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আরেকজন উল্লেখযোগ্য প্রার্থী আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি। তিনি ২০১৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা—IAEA-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক ঝুঁকি ও জটিল কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে এই প্রতিযোগিতার অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সালও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তিনি সেনেগালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারপারসনও ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করা এবং নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব রয়েছে।

ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা গার্সেসও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। তাঁর পরিকল্পনার পাঁচটি মূল ক্ষেত্র হলো শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ডিজিটাল ও জ্বালানি রূপান্তর, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করা এবং সংস্থাটির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন।

উগান্ডার ওলারাওতুন্নুও দীর্ঘ জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তিনি জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এবং শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। অন্যদিকে ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতিসংঘ সংস্কার ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকে তাঁর প্রার্থিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

এই নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে একটি ঐতিহাসিক বিষয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেননি। বর্তমান প্রতিযোগিতায় একাধিক নারী প্রার্থী রয়েছেন। ফলে ২০২৭ সালে প্রথমবারের মতো একজন নারী জাতিসংঘের মহাসচিব হতে পারেন—এমন সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এটি এখনো সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে; কোনো প্রার্থীকে নিশ্চিত বলে ঘোষণা করা হয়নি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক ভারসাম্য। জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে লিখিত কোনো বাধ্যতামূলক আঞ্চলিক রোটেশন ব্যবস্থা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি অনানুষ্ঠানিক রীতি অনুসরণ করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে নেতৃত্বের ভারসাম্য বজায় থাকে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রেবেকা গ্রিনস্প্যান ও ইভোনে এ-বাকি এবং মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা এই অঞ্চলের প্রার্থী।

তবে প্রতিযোগিতার সমীকরণ এখনো অত্যন্ত তরল। তিন দফা গোপন স্ট্র পোলের পরও কোনো প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে এমন সমর্থন অর্জন করতে পারেননি, যা তাঁকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। কূটনৈতিক মহলে নতুন কোনো প্রার্থী শেষ মুহূর্তে প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করতে পারেন—এমন আলোচনাও রয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ যৌথভাবে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর নতুন মহাসচিব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বা ‘vision statement’ এবং নির্বাচনী অর্থায়ন-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রার্থীদের সঙ্গে সাধারণ পরিষদে ইন্টার‌্যাকটিভ ডায়ালগ এবং জুলাইয়ে একটি বৈশ্বিক ‘UN Town Hall’ অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশের কূটনীতিক খলিলুর রহমান এখন এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী পর্যায়ে সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে ভূমিকা পালন করছেন।

আগামী কয়েক মাসে নিরাপত্তা পরিষদে আরও গোপন ভোট হতে পারে। শেষ পর্যন্ত যে প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য—এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটোর মুখে পড়বেন না এবং অন্তত নয়টি সমর্থন অর্জন করবেন, তাঁর নাম সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করা হবে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেবে।

নতুন মহাসচিব যে-ই হন, তাঁর সামনে থাকবে অত্যন্ত কঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র-চীনসহ বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, মানবিক সংকট এবং জাতিসংঘের আর্থিক সংকট—সবকিছু একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার, নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকটও নতুন মহাসচিবের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত রেবেকা গ্রিনস্প্যান নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ প্রকাশিত স্ট্র পোলে সামান্য এগিয়ে থাকলেও তাঁকে ‘পরবর্তী মহাসচিব’ হিসেবে নিশ্চিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ক্যারোলিন রড্রিগেস বিরকেট, রাফায়েল গ্রোসি এবং অন্য প্রার্থীরাও এখনও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। এমনকি শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো সমঝোতাপ্রার্থী সামনে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল বক্তব্য হলো—জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের দৌড়ে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও নির্বাচন এখনো উন্মুক্ত এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা পরিষদের কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে।

Translate