চট্টগ্রাম বন্দরে এক বছরে রাজস্ব বেড়েছে ৯৯৯ কোটি টাকা

চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম সাত মাস ১১ দিনে কনটেইনার ও জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো বেড়েছে। একই সময়ে কনটেইনারবাহী জাহাজের বন্দরে অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে সামগ্রিক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সামান্য পতন হয়েছে। সবমিলিয়ে বন্দরের কাজে গতি আসায় গত এক বছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে ৯৯৯ কোটি টাকার বেশি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১১ আগস্ট পর্যন্ত কনটেইনার ওঠানো-নামানো বেড়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে বন্দরে ২ দশমিক ৪১ লাখ টিইইউএস কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ১৪৪ লাখ টিইইউএসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের ওঠানামার মধ্যেও কনটেইনার ওঠানো-নামানোর এই গতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।

একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাস ১১ দিনে যেখানে ২ হাজার ৫৮৮টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪৭টি বা প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সামান্য পতন

তবে এই সময়ে বন্দরে মোট কার্গো হ্যান্ডলিং কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত বন্দরে ৮৪ দশমিক ২১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ৮৩ দশমিক ৫১ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ফলে মোট কার্গো হ্যান্ডলিং কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

বহিনোর্ঙরে কমেছে জাহাজের অপেক্ষার সময়

বন্দরের কার্যক্রমে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে কনটেইনারবাহী জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে যাওয়ায়। ২০২৫ সালে একটি কনটেইনার জাহাজকে বন্দরে প্রবেশের জন্য গড়ে ৪ দশমিক ০৮ দিন অপেক্ষা করতে হতো। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২৩ দিনে। অর্থাৎ জাহাজের অপেক্ষার সময় কমেছে ২ দশমিক ৮৫ দিন বা প্রায় ৭০ শতাংশ।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, জেটি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, দ্রুত কনটেইনার খালাস এবং অপারেশনাল কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

টার্ন অ্যারাউন্ড টাইমেও উন্নতি

জাহাজ বন্দরে ভেড়ানো থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে ফিরে যেতে যে সময় লাগে, সেটিও কমেছে। জাহাজের ক্ষেত্রে এ সময়টাকে বলা হয় ‘টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম’। ২০২৫ সালে একটি জাহাজের বন্দরে অবস্থান ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে ফিরে যেতে গড়ে ২ দশমিক ৬০ দিন সময় লাগতো। চলতি বছরে তা কমে হয়েছে ২ দশমিক ২৮ দিন। ফলে টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমেছে শূন্য দশমিক ৩২ দিন বা প্রায় ১২ শতাংশ।

পরিবর্তন নেই ডুয়েলিং টাইমে

তবে বন্দরে আমদানি করা কনটেইনার বন্দরে কতদিন অবস্থান করে, সেই ডুয়েলিং টাইমে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ২০২৫ সালে কনটেইনার ডুয়েলিং টাইম ছিল গড়ে ৯ দশমিক ৫৬ দিন। চলতি বছরে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ৫১ দিনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ দিন।

রাজস্ব আয়ে গতি

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব ব্যয় কমায় আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা রাজস্ব উদ্বৃত্তও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসের হিসাবের সঙ্গে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রাজস্ব আয় ছিল ২ হাজার ৯৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ৯৯৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

ছয় মাসে ব্যয় কমেছে ৫৪ কোটি টাকা

বন্দরে রাজস্ব ব্যয়ে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৪৪৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব ব্যয় কমেছে ৫৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

রাজস্ব উদ্বৃত্তে প্রবৃদ্ধি

রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় কমে যাওয়ায় রাজস্ব উদ্বৃত্তে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৫০১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৫৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়েছে ১ হাজার ৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি রাজস্ব ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে উদ্বৃত্তের পরিমাণও আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয়ে চলে গেলেও চলতি অর্থবছরে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়ের পরিমাণ কমে আসায় রাজস্ব উদ্বৃত্তের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রফতানি কনটেইনার জাহাজীকরণে রেকর্ড

বন্দরে এক জাহাজে সর্বোচ্চ রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজীকরণের নতুন রেকর্ড হয়েছে। ১২ আগস্ট জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) ১১ নম্বর জেটি থেকে মার্স্ক লাইনের ‘মারস্ক বিন্টুলু’ জাহাজে ৯৩৩ বক্স রফতানি পণ্যবাহী লোড কনটেইনার জাহাজীকরণ করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১ হাজার ৭৮৪ টিইইউএস রফতানি পণ্য ছিল।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক জাহাজে রফতানি পণ্যবাহী লোড কনটেইনার জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে এটিই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে গত ১৮ জুন এক জাহাজে সর্বোচ্চ ৭৪২ বক্স বা ১ হাজার ৪৩৯ টিইইউএস রফতানি পণ্যবাহী লোড কনটেইনার জাহাজীকরণের রেকর্ড ছিল।

এদিকে ‘মারস্ক বিন্টুলু’ জাহাজে ১৪৪ বক্স খালি কনটেইনারও জাহাজীকরণ করা হয়, যা ১৪৭ টিইইউএসের সমান। ফলে ওই জাহাজে সবমিলিয়ে ১ হাজার ৭৭ বক্স কনটেইনার জাহাজীকরণ করা হয়, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৩১ টিইইউএস।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আয় বেড়েছে। আশা করছি পুরো বছরে এই সফলতা আরও বাড়বে।’

Translate