বুধবার ৮ই জুলাই, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের ক্ষোভ বুকে নিয়ে ন্যাটো সম্মেলনে তুরস্কে ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেসব মিত্রদেশ সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাদের ওপর এখনও চরম ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ বুকে নিয়েই মঙ্গলবার তুরস্কের আঙ্কারায় শুরু হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন তিনি। আর মিত্রদেশগুলো যেন তার এই মনোভাবের কথা স্পষ্ট জানতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই তিনি সেখানে যাচ্ছেন।

বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প প্রকাশ্যে একটি প্রশ্ন তুলে আসছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার যে সুরক্ষার ওপর ভরসা করে মিত্ররা চলছে, তারা আসলে সেই সুরক্ষার যোগ্য কি না; তারা যথেষ্ট শক্তিশালী ও অনুগত কি না। সম্প্রতি ইরানের ওপর মার্কিন হামলার জন্য বিমানঘাঁটি খুলে দিতে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার অভিযানে সেনা পাঠাতে কিছু মিত্রদেশের অস্বীকৃতি ট্রাম্পের সেই সংশয়কে এখন প্রকাশ্য অবজ্ঞায় রূপ দিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের পর থেকে ট্রাম্প জনসমক্ষেই ইউরোপীয় নেতাদের অপমান করে আসছেন। এমনকি যেসব নেতা একসময় ভাবতেন ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক মার্কিন ক্ষোভ থেকে তাদের রক্ষা করবে, তারাও রেহাই পাচ্ছেন না। ট্রাম্প ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে উপহাস করে দাবি করেছেন, মেলোনি জি-৭ সম্মেলনে তার সঙ্গে একটি ছবির জন্য ‘অনুনয়’ করেছিলেন। সোমবার মেলোনির একটি মিম শেয়ার করে ট্রাম্প ক্যাপশনে লেখেন, এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা (রেস্ট্রেনিং অর্ডার) প্রয়োজন।

এ ছাড়া, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের খবরটি ট্রাম্প নিজেই প্রথম ফাঁস করেন। পরে স্টারমারকে ‘দুর্বল’ আখ্যা দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, ইরান ইস্যুতে স্টারমারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রমাণ করে তিনি কোনোভাবেই ‘উইনস্টন চার্চিল’ নন। এমনকি ইউরোপের ট্রাম্পকে শান্ত করতে পটু হিসেবে পরিচিত ন্যাটো প্রধান মার্ক রুত্তেও গত মাসে ব্যর্থ হন। রুত্তে স্বর্ণ দিয়ে লেখা একটি চার্ট ট্রাম্পকে দেখান, যেখানে ন্যাটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে খরচের পরিমাণকে ‘দ্য ট্রাম্প ট্রিলিয়ন’ হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল। কিন্তু সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবা ট্রাম্প একে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের তাদের টাকার প্রয়োজন নেই, আমাদের কিছুরই দরকার নেই। আমি কেবল আনুগত্য চাই।’

ইউরোপে এখন বড় ভয় কাজ করছে যে, ট্রাম্পের এই অবজ্ঞা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমব্যাট টিম চার থেকে কমিয়ে তিনে নামিয়ে এনেছে, যার ফলে পোল্যান্ডে পরিকল্পিত প্রায় ৪ হাজার সেনা মোতায়েন বাতিল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে যেকোনও সংকটে ন্যাটোর ব্যবহারের জন্য মজুত রাখা যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্কার ও যুদ্ধজাহাজের সংখ্যাও কমিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইউরোপকে এখন আমেরিকার কম শক্তি বা সমরাস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।

গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে ছয় মাসের একটি পর্যালোচনা ঘোষণা করেন। ইরান হামলায় বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় মিত্রদের ‘লজ্জাজনক’ বলে কটূক্তি করেন তিনি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই পর্যালোচনার ফলে ইউরোপে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। অন্য একজন কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, সম্মেলনে ন্যাটোর সেনা কমানোর বিষয়টি সরাসরি আলোচনার টেবিলে নেই, তবে প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয়দের ওপর খুশি নন। এটি সেই পুরোনো গল্পই।

ন্যাটোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার রবিবার সাংবাদিকদের জানান, ট্রাম্প মিত্রদের প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেবেন। এর উদ্দেশ্য হলো ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার বোঝা ইউরোপ ও কানাডার ওপর চাপানো। প্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, ট্রাম্প এখনও ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। তিনি মনে করেন, আর্কটিক মহাসাগরে রাশিয়াকে রুখতে এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা চাহিদা মেটাতে এটিই সেরা উপায়। তবে ডেনমার্ক এবং ন্যাটো মিত্ররা এর তীব্র বিরোধী।

মঙ্গলবার বিকালে আঙ্কারায় পৌঁছে ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। এরদোয়ান ন্যাটোর সেই অল্প কয়েকজন নেতার একজন, যিনি এখনও ট্রাম্পের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন। তবে এই বৈঠকেও ইরানের রেশ থাকবে। শুক্রবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন যেন তুরস্কের কাছে উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রি না করা হয়, যার কারণ হিসেবে তিনি এরদোয়ানের ইসরায়েলবিরোধী ক্রমবর্ধমান বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

বুধবার ট্রাম্প ন্যাটোর কার্যনির্বাহী অধিবেশনে অংশ নেবেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এরপর একটি সংবাদ সম্মেলন শেষে বুধবার সন্ধ্যায় তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরে যাবেন।

ন্যাটো সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকগুলোর মধ্যে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা আশা করছেন, তিন সপ্তাহের মধ্যে এটি তাদের দ্বিতীয় বৈঠক এবং এর মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের বিষয়ে অগ্রগতি হবে। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বার্তা অনুযায়ী, রণক্ষেত্রে ইউক্রেন এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তাই হোয়াইট হাউসের নতুন কোনও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার তাড়া নেই।

গত মাসে জি-৭ সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প এবং ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, গত বছর আলাস্কা সম্মেলনে যুদ্ধ সমাপ্তির নীতি নিয়ে পুতিনের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা থেকে তিনি সরে আসতে পারেন। সপ্তাহান্তে ট্রাম্প জেলেনস্কি ও পুতিন উভয়ের সঙ্গেই কথা বলেছেন। সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি সে (পুতিন) চাপ অনুভব করছে। সে এর অবসান চায়। ইউক্রেনও অবসান চায়। আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছি।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা মনে করি পুতিন এই যুদ্ধের অবসান চান কারণ এটি এখন তার জন্য অতিরিক্ত হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, স্থবিরতা এবং মৃত্যুর ক্ষতির পরিমাণ আকাশচুম্বী। তার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো সেনা ফুরিয়ে আসছে।

তবে ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে আরও বলেন, কিন্তু পুতিন আমাদের মতো করে ভাবেন না। তাই আমরা যেটাকে থামার জন্য যৌক্তিক মনে করছি, তিনি হয়তো তা মনে নাও করতে পারেন।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

 

Translate