শুক্রবার ২২শে মে, ২০২৬

ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিশ্র বার্তা

চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানে ওয়াশিংটনের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ভাগ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে মিশ্র সংকেত বা বার্তা বিনিময় হয়েছে।

ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএ বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে জানায়, তেহরান বর্তমানে মার্কিন প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করছে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া বা জবাব প্রস্তুত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ এই প্রস্তাবটি দুই পক্ষের মধ্যকার ‘ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে এনেছে’।

চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরানের কাছে নিজেদের সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরানের জবাবের জন্য তিনি ‘কয়েক দিন’ অপেক্ষা করবেন। ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েক দিন অপেক্ষা করে যদি আমি একটি যুদ্ধ থামাতে পারি, যদি কয়েক দিন অপেক্ষা করে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারি, তবে আমার মনে হয় এটি করাটাই দারুণ একটি বিষয়।’

তবে মূল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষ একে অপরের থেকে কতটা দূরত্বে রয়েছে তা এখনও অস্পষ্ট। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ধরে রাখার বিষয়ে ইরানের জেদ এবং হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান কী, তা পরিষ্কার নয়।

রয়টার্স বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি একটি নির্দেশনা জারি করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, দেশটির প্রায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের মজুদ কোনোভাবেই বিদেশে পাঠানো যাবে না।

ইরান দীর্ঘ দিন ধরেই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের পক্ষে জোর দিয়ে আসছে, যা সরাসরি মার্কিন অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার চেয়ে এক ধাপ দূরে।

সর্বশেষ এই প্রস্তাবটি পাঠানোর আগে ওয়াশিংটন ইরানের একটি পাল্টা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। তেহরান টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওই পাল্টা প্রস্তাবে আলোচনার জন্য দুই স্তরের একটি কাঠামোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। যার প্রথম ধাপে সব যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয় ধাপে পারমাণবিক ইস্যুটি নিয়ে আলোচনার কথা বলা হয়েছিল, যা ইরানের শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইরান কি তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিজের কাছে রাখতে পারবে? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরওবলেন, ‘আমরা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে নেব। আমাদের এটার প্রয়োজন নেই। আমরা এটা চাইও না। এটা পাওয়ার পর আমরা সম্ভবত তা ধ্বংস করে ফেলব। কিন্তু আমরা তাদের কাছে এটা রাখতে দেব না।’

পরে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই আলোচনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আলোচনার বিভিন্ন দিক নিয়ে যেসব অনুমান বা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে, তার কোনোটিই নিশ্চিত নয়।’ ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাঘাই বলেন, এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা’। সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান বা সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়াসহ পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর ‘কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

এদিকে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাকিস্তান তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা একের পর এক তেহরান সফর করছেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বুধবার ইরান সফর করেছেন, যা এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে তার দ্বিতীয় সফর ছিল।

বৃহস্পতিবার ইরানি গণমাধ্যম জানায়, ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের বৃহস্পতিবার তেহরানে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে আল অ্যারাবিয়া’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মুনির বৃহস্পতিবার ইরান সফর করছেন না।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তিনি বিশ্বাস করেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা তেহরান সফর করবেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আশা করছি এটি এই প্রক্রিয়াটিকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে একমাত্র প্রত্যক্ষ বা সরাসরি বৈঠকের আয়োজন করেছিল ইসলামাবাদ। ফলে এই আলোচনার ক্ষেত্রে তারা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

সূত্র: আল-মনিটর

Translate