মঙ্গলবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৬

ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি: প্রধানমন্ত্রী

জুলাই সনদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিলেও কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি কমিশন করেছিল। এর মধ্যে সংবিধান আছে, বিচারের বিষয় আছে, প্রশাসনিক আছে, স্বাস্থ্য আছে, নারী আছে। কিন্তু এখন যারা এ সংস্কার সংস্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে; তারা কিন্তু নারীর স্বাধীনতা অথবা নারীর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলে না। আমরা কিন্তু ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি।’

গতকাল সোমবার বিকেলে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় মঞ্চে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। বিকেল পৌনে ৬টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চে এসে পৌঁছালে হাজারো সমর্থক মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর বগুড়ায় এটিই তারেক রহমানের প্রথম জনসভা। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি আলতাফুন্নেছা মাঠে নির্বাচনী জনসভা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘জুলাই সনদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিলেও কিছু রাজনৈতিক দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। আজ এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, এই মিডিয়ার সামনে পরিষ্কারভাবে আমি আবারও বলে দিতে চাই—সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর আমরা এক এক করে বাস্তবায়ন করব. ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, ‘বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেওয়ার পরও আমরা দেখলাম, কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য যে চিকিৎসা কমিশন করা হয়েছিল; মানুষ যাতে ওষুধ সহজে পেতে পারে, চিকিৎসা সহজে পেতে পারে, সেটির ব্যাপারে কোনো কথা বলে না। কীভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে, সেটির কথা বলে না। কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে, সেটির কথা বলে না; তারা শুধু সংবিধান সংবিধান এ বিষয়ে কথা বলে।’

‘গুপ্তরা আবারও বিভ্রান্তের কাজ শুরু করেছে’: প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমি আপনাদের বলেছিলাম, কীভাবে তারা বিভ্রান্ত করছে। এই গুপ্ত বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্তের কাজ শুরু করেছে। দুদিন আগের ঘটনা, ময়মনসিংহের ওদিকে। একটি ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনা ঘটেছে। এক ছেলে এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করত, তারা বিয়ে-শাদি করেছে, তাদের পরিবারের সমস্যা; দেখেছেন আপনারা, ফেসবুকে দেখেননি? কিন্তু সঙ্গে কি এটাও দেখেছেন—একটি পারিবারিক, একটি ব্যক্তিগত ঘটনাকে কারা রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তির সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, দেখেছেন আপনারা সবাই?’

সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী: দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি আপনাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে তার প্রতিটি কাজ শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ইমাম-মোয়াজ্জিনদের সম্মানীর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন হলে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।’

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বল্প খরচে দেশের তরুণ সমাজের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ, শিগগির আপনারা সুখবর পাবেন। এ ছাড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ আমরা আবার দেশব্যাপী শুরু করব। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে, যাতে কৃষকের ফসল রক্ষা পায় এবং খরা মৌসুমে পানির অভাব না হয়।’

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের কাজ দ্রুত শুরু করার প্রতিশ্রুতি: বগুড়ার স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথের কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য বগুড়া বিমানবন্দরকে কার্গো বিমান ওঠানামার উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সেইসঙ্গে নবঘোষিত সিটি করপোরেশনকে একটি পরিকল্পিত ও নান্দনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দেন।

মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাট আর দুর্নীতি হয়েছে: তারেক রহমান বলেন, “যখন স্বৈরাচারের ভয়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ‘সংস্কার’-এর ‘স’ শব্দটিও উচ্চারণ করার সাহস পায়নি, তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি দিয়েছিল। কারণ আমরা দেখেছিলাম কীভাবে গত ১৬ বছরে দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মেগা প্রজেক্টের নামে শুধু লুটপাট আর দুর্নীতি করা হয়েছে।”

জনসভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্ট দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। জনগণের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের স্বচ্ছ প্রস্তাবনা সেখানে জমা দিয়েছি। আমরা সবসময় বলি, আমরা যা করব স্বচ্ছভাবে করব, কোনো লুকোচুরি নেই। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবেই; কিন্তু আমাদের লক্ষ্য দেশের মানুষের উন্নয়ন।’

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা। সভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন।

Translate