সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো—যেখানে বিচার বিভাগ, শাসনব্যবস্থা ও জনগণের অধিকার প্রশ্নে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অপমানের জবাব কিছুটা হলেও মিলেছে। ধানমন্ডির নিজ বাসা থেকে বৃহস্পতিবার সকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর রাতেই আদালতে তোলা হয় এবং শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি এখন যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আব্দুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি।
দেশজুড়ে এই গ্রেফতার নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো পর্যন্ত একে যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে অভিহিত করছে। বিশেষত, বিএনপি ও জামায়াতসহ একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল সরকারের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরুর দাবি তুলেছে। গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র কায়েমে বিচার বিভাগের অপব্যবহার ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তারই এক বিচারিক প্রতিফলন যেন এবারের এই গ্রেফতার।
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, সংবিধান সংশোধন নিয়ে রায় জালিয়াতি, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আত্মসাৎ—এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও ফতুল্লা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। বিশেষত, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আহাদকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি চতুর্থ আসামি। এ মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় পাঁচশ’ জনের নাম রয়েছে।
এই বিচারিক প্রক্রিয়া আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, আদালতে খায়রুল হককে মাথায় হেলমেট ও হাতে হ্যান্ডকাফ পরে আনা হয় এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবীরা ‘খায়রুলের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’ স্লোগান দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালতে শুনানির সময় বিদ্যুৎ চলে গেলেও, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হয়—যা যেন এক প্রতীকী বার্তা দেয়, বিচার থেমে নেই, থামবেও না।
এই গ্রেফতার শুধু একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে নয়, এটি পুরো বিচারব্যবস্থার অতীত কলঙ্ক ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক রূপ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের নেতৃত্বে থেকেও কীভাবে একটি নির্দলীয় ও স্বাধীন সংবিধানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যায়—তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছেন এবিএম খায়রুল হক। তিনি যেভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য আইন ও বিচারব্যবস্থাকে একপাক্ষিক করে তুলেছিলেন, তা আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।
তবে এটাও সত্য, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির কারাগারে যাওয়া রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য সুখকর ঘটনা নয়। কিন্তু এটি প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যে বার্তা দরকার, তা এই একটি পদক্ষেপেই অনেকটা দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষে বলা যায়, এই গ্রেফতার কোনো প্রতিহিংসা নয়, এটি জনগণের বহু বছরের আস্থা ও অধিকার ফিরে পাওয়ার একটি পথচলা মাত্র। এবং সেই পথচলা যেন আর থেমে না যায়—এটাই দেশের প্রত্যাশা।