রবিবার ১৯শে জুলাই, ২০২৬

ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট: আইনজীবীদের ক্ষোভ, আছে সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতাও

দেশের বিচার বিভাগ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে গঠন করা হয়েছিল বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। সেই কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ ২৮ দফা প্রস্তাবনা সুপারিশ আকারে তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার কাছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল— দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাবনা। তবে এমন প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আইনজীবীরা।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা অনুসারে ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাবনার প্রতিবাদে গত ৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল করেন সাধারণ আইনজীবীরা। এসময় তারা প্রস্তাবনাটিকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেন।

বিক্ষোভকারী আইনজীবীদের অভিযোগ— ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট স্থানান্তর না করতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা না মেনে এমন প্রস্তাবনা দিয়েছে সংস্কার কমিশন, যা আদালত অবমাননার শামিল। বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থানান্তর হলে ন্যায়বিচার বিচ্যুত হবে, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। এতে দুর্বল হবে বিচারব্যবস্থা। এছাড়া, ঢাকার বাইরে মেধাবী আইনজীবীদের সংকটও রয়েছে— যা বিচার ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেন তারা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদের আলোকে বাংলাদেশে যে সুপ্রিম কোর্ট থাকবে, তার স্থায়ী বেঞ্চ রাজধানীতে থাকবে। এরপরও বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠন করা হলে সেখানেও ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের মতো অবস্থা হয়ে যাবে। নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে মানুষ যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে, সেই সুবিধা তারা পাবেন না।’

সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে। তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে প্রধান বিচারপতি সময়ে সময়ে অন্য যে স্থান বা স্থানগুলোতে নির্ধারণ করবেন, সেই স্থান বা স্থানগুলোতে হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে পারবে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংবিধানের অষ্টম অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্ট থেকে বাতিল হয়েছে। সেখানে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বাতিল করে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। তাহলে সে রায়ের কী হবে? সে রায়টিতো বাতিল করতে হবে।’

ইতিহাস থেকে দেখলে, ১৯৮৮ সালে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের ৬টি বেঞ্চ বসানো হয়েছিল। পরে সেই সংশোধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হয় হাইকোর্টে। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৪ সদস্যের আপিল বিভাগ ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে রায় দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে যত খারাপ স্বৈরশাসক আসুক— মানুষ কিছুটা হলেও হাইকোর্টে এসে ন্যায় বিচার পায়। সেটিও এবার শেষ করে দেবে বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থানান্তরিত করে। হাইকোর্টকে বিভাগ বা জেলায় নিলে এটাও ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বা সেশন কোর্টের স্ট্যাটাসে পরিণত হবে।’

‘প্রায় এক বছর হয়ে গেলো বিচার বিভাগের জন্য সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। যদি পৃথক সচিবালয় করার মাধ্যমে বিচার বিভাগকে শক্তিশালী না করতে পারেন, তাহলে বিভাগীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করলে তা নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে? বিচার বিভাগ নিয়ে আইনজীবীরা ও বিচারপ্রার্থীরা যে সংস্কার আশা করেছিল, তার কিছুই হয়নি। আমরা হতাশ,’ বলেও মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

Translate