বিনোদন অঙ্গনে হরহামেশা সংসার ভাঙার খবর শোনা যায়। এর মধ্যে ব্যতিক্রমও আছে। তেমনই ব্যতিক্রম আবুল হায়াত, আজ তাঁর সংসারজীবনের ৫৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। মেজ দুলাভাই মনিরুজ্জামানের ছোট বোন মাহফুজা খাতুন শিরিনের সঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছেন দাম্পত্যজীবনের ৫৫টি বছর। এই দীর্ঘ সংসার জীবনযাপনের একটাই রহস্য—বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা, সুখ–দুঃখ সবকিছুকে হাসিমুখে ভাগ করে নেওয়া।
আবুল হায়াতের লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘রবি পথ-কর্মময় ৮০’ থেকে জানা যায়, পরিবারের সঙ্গে আবুল হায়াত থাকতেন চট্টগ্রামে। আর মাহফুজা শিরিন ঢাকার অদূরে বেরাইদে। বড় ভাইয়ের বিয়েতে পরিবারের সঙ্গে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে। দুজনের প্রথম দেখা সেখানেই। তখন মাহফুজা শিরিনের বয়স চার বছর আর আবুল হায়াত ১০ বছরের। আত্মীয়তার সূত্রে দুজনের বিভিন্ন সময় দেখাসাক্ষাৎ হতো। তবে প্রেম হয় যখন তখন সময়টা ১৯৬৬ সাল, আবুল হায়াত তখন তৃতীয় বর্ষে পড়েন আর মাহফুজা শিরিন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ সময়টায় চিঠি লেখালেখি শুরু হয়। অনেক বাধা পেরিয়ে চিঠি বেচারা আসত–যেত দুজনের কাছে। ১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেজ দুলাভাই আবুল হায়াতকে সিনেমা দেখতে ঢাকার বলাকা প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যান। সেখানে বিয়ে নিয়ে প্রথম আলাপ। এরপর পারিবারিকভাবে কথাবার্তা এগোয়। দুই পক্ষের মুরব্বিরা মিলে ১৯৭০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁদের আক্দ করান। এরপর কেটে গেছে ৫৫ বছর। অনেক চড়াই–উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে দুজনের জীবন পার হয়েছে। এত কিছুর মধ্যে দুজন দুজনকে আঁকড়ে ছিলেন।
আবুল হায়াতের মতে, ‘যাত্রাপথে কতশত আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, বাধা-বিপত্তি—সবকিছু আমরা বিশ্বাস, আস্থা আর ভালোবাসায় হাসিমুখে ভাগ করে নিয়েছি। সত্যি, জীবন কত চ্যালেঞ্জিং এবং মধুময়!’ মাহফুজা খাতুন শিরিনকে অভিনেতা আবুল হায়াত বিয়ে করেন ৫৫ বছর আগের এই দিনে। সেই দাম্পত্যজীবনের আজ ৫৫ বছর পার হলো। সুখে–দুঃখে একজন মানুষের সঙ্গে ৫৫ বছর পার করে দেওয়াটা আজকালকার হুটহাট সংসার ভাঙার এই সমাজে দারুণ এক দৃষ্টান্ত, উৎসবের উপলক্ষও বটে।
সুখ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে আবুল হায়াত বলেন, ‘সুখ হচ্ছে মানুষের চাওয়া। আকাঙ্ক্ষা। এটার একটা সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। চাওয়া কম থাকলে একটা মানুষের প্রাপ্তিটা বেশি হয়। আমি আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি—চাইবা কম, তাহলে দেখবে সব সময় পাবে বেশি। আর বেশি চাইলে দেখবে নিরাশ হতে হচ্ছে। যা তোমার জীবনে একটা নেতিবাচক দিক চলে আসবে। সারা জীবন আমি সেটাই অনুসরণ করেছি। আমার চাওয়াটা সব সময় খুবই অল্প ছিল, কিন্তু সারা জীবন সবচেয়ে বেশিই পেয়েছি।’
বিনোদন জগতের বিচ্ছেদের খবর যতটা চর্চিত হয়, মিলনের খবর ততটা নয়। তাই সাধারণ দর্শকদের মতে, তারকাদের সংসার গড়া হয় ভাঙার জন্য। আসলেই তা–ই? দিন শেষে একজন তারকাও অন্যদের মতো সাধারণ মানুষ। এমন অসংখ্য তারকা দম্পতি আছেন, যাঁরা দশকের পর দশক একই ছাদের নিচে বাস করছেন। নতুন প্রজন্মের জন্য তাই আবুল হায়াত বলেন, ‘আমি সবাইকে বলতে চাই বিশ্বাস, আস্থা ও ভালোবাসা নিয়েই এগিয়ে যেতে। চাওয়ার সীমাবদ্ধতাও যেন থাকে। কোনো কিছুতে ক্রেজি হলে চলবে না। এমন মানসিকতা পোষণ করব না যে আমার এটা পেতেই হবে। এটা করতে হবে। অমুকের মতো হতে হবে। অমুকের মতো করতে হবে। নিজের মতো করে ভালোবেসে কাজ করে যেতে হবে। স্বামী কিংবা স্ত্রীর কেউ কাউকে যেন না বলে, কেন আমার মতো হতে পারছ না, এসব অস্থির মানসিকতা দুজনকে পরিহার করতে হবে। তা না হলে কোনো সম্পর্কই টিকবে না। এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি অস্থিরতায়ও ভোগে। কোনো ধরনের অ্যাফোর্ট দেওয়া ছাড়া তাঁরা যেকোনো কিছু পেতে চায়—এটাও সবচেয়ে বড় সমস্যা।