ইরানের অব্যাহত হামলার মুখে বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি রক্ষায় বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মিত্র দেশগুলোর সমর্থন ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে দুই ধাপে ৪ হাজারেরও বেশি মার্কিন মেরিন সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে পেন্টাগন।
গত বৃহস্পতিবার সান ডিয়েগো থেকে ইউএসএস বক্সারের নেতৃত্বে একটি নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। এই বহরে রয়েছে ১১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটের (এমইউ) ২ হাজারেরও বেশি সেনা। এর আগে ওকিনাওয়াভিত্তিক ৩১তম এমইউ-এর আরও ২ হাজার ২০০ সেনার মোতায়েন অনুমোদন করে পেন্টাগন।
দুটি এক্সপিডিশনারি ইউনিটের সঙ্গেই থাকছে অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এফ-৩৫ লাইটনিং-২ ফাইটার জেট, এম৭৭৭ হাউইটজার কামান, স্টিঙ্গার-ভিত্তিক মোবাইল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন বিধ্বংসী বিশেষ প্রযুক্তি।
এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিটে থাকছে এক ডজন এমভি-২২ অস্প্রে বিমান, যা দ্রুততম সময়ে যুদ্ধসজ্জিত সেনাদের অবতরণ করাতে সক্ষম। ভারী সরঞ্জাম ও কামানের জন্য থাকছে সিএইচ-৫৩ চিনুক হেলিকপ্টার এবং দূরপাল্লার এনএমইএসআইএস নেভাল স্ট্রাইক মিসাইল ও হিমার্স লাঞ্চার।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। আটকে আছে হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ।
পেন্টাগনের শীর্ষ জেনারেল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, মার্কিন হামলায় ইতোমধ্যে ইরানের পুরো সারফেস ফ্লিট, ১১টি সাবমেরিন এবং ৪৪টি মাইন পাড়ার জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ইরান এখনও তাদের ছোট ও দ্রুতগামী বোট ব্যবহার করে প্রণালিতে মাইন ছড়িয়ে দিতে পারে। ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে ইরানের জন্য ‘এক ধরনের আত্মহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার দ্রুতগামী বোট রয়েছে, যার বেশিরভাগই মাটির নিচের বাঙ্কার ও সুড়ঙ্গে লুকানো। কেবল বিমান হামলা চালিয়ে এগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, এখানেই মেরিন সেনাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তারা উপকূলীয় এলাকায় আইআরজিসি-র নৌ-ঘাঁটিগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালাতে পারে। এমনকি বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারগুলোতে অবস্থান নিয়ে ইরানের ড্রোন বা দ্রুতগামী বোটের হামলা প্রতিহত করতে পারে।
হোয়াইট হাউস এখন ইরানের বৃহত্তম তেল রফতানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ দখলের কথা ভাবছে। গত সপ্তাহে এই দ্বীপের ৯০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, খার্গ দ্বীপে স্থল সেনা পাঠানো মানেই বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি নেওয়া। একবার দ্বীপে অবস্থান নিলে মার্কিন সেনারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
ট্রাম্প একদিকে ন্যাটো মিত্রদের ‘ভীতু’ বলে গালি দিচ্ছেন, আবার বলছেন ‘কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই’। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। ইতোমধ্যে ১৩ জন মার্কিন সেনা এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন এবং ২০০-র বেশি আহত। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন ট্রাম্প ইরানে স্থল সেনা পাঠাবেন, কিন্তু মাত্র ৭ শতাংশ নাগরিক এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মাইকেল আইজেনস্টাট বলেন, এই মিশন আমাদের সক্ষমতাকে চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে ফেলবে। এমনকি লক্ষ্য অর্জিত হলেও ইরান দীর্ঘদিন সমুদ্রপথে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: আল-মনিটর