রবিবার ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬

হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭ জন হাসপাতালে, রিপোর্ট পেতে লাগে ১৫ দিন

গোপালগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী আরও বেড়েছে। জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে রোগী। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ তীব্র আকার ধারণ করায় প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে নিয়ে আসছেন স্বজনরা। এখন পর্যন্ত এক শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে নমুনা নেওয়ার পর ১৫ দিনেও প্রতিবেদন মিলছে না বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২ জন রোগী চিকিৎসাধীন। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। গত জানুয়ারি মাস থেকে শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) পর্যন্ত ৬২ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে একজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া মুকসুদপুর উপজেলায় ১০ মাসের এক কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে।

আক্রান্ত রোগীদের স্বজনরা জানান, প্রথমে প্রচণ্ড জ্বর, সর্দি ও কাশির মাধ্যমে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। এর কয়েক দিন পর সারা শরীরে লালচে র‍্যাশ বা গুটি দেখা দিচ্ছে।

গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আক্রান্তদের সাধারণ রোগীদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। তাদের জন্য প্রতিটি হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ‘আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে সুস্থ মানুষ থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। আক্রান্তদের প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি এবং পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে। সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।’

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ১৬ জন গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন আছে।

আক্রান্ত শিশুদের কয়েকজন স্বজন জানান, আক্রান্তদের প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করেছিলেন। কিন্তু শরীরে দানা ওঠার পর আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখন তাদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। নমুনা নেওয়া হয়েছে। তবে নমুনা নেওয়ার ১৫ দিনেও মিলছে না প্রতিবেদন।

সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে, গোপালগঞ্জে হাম শনাক্তের জন্য কোনও ল্যাবরেটরি নেই।
ফলে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। একটি নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। তবে নমুনার চাপ বেশি থাকলে এই সময় ১৫ দিন বা তারও বেশি লাগতে পারে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘আমরা আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিতে কাজ করছি। আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা আছে। তবে এই সময়ে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের কোনও জেলা পর্যায়ে হাম শনাক্তের জন্য ল্যাব সুবিধা নেই। তাই নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়। গোপালগঞ্জ থেকে সপ্তাহে একবার অথবা সর্বোচ্চ দুবার নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে রোগের লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ায় চিকিৎসা দিতে তেমন কোনও সমস্যা হচ্ছে না। জেলার সব সরকারি হাসপাতালে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে কোনও রোগী আসলে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো এবং সিভিল সার্জন অফিসকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৭ মার্চ মুকসুদপুর উপজেলার টেংরাখোলা ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা তুহিন শেখের ১০ মাস বয়সী মেয়ে তুবা ইসলাম তোহা হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এর আগে ১৯ মার্চ তার জ্বরসহ হামের লক্ষণ দেখা দেয়। ঘটনার পর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি দল শিশুটির বাড়ি পরিদর্শন করে। একইসঙ্গে আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

Translate