ক্ষমতায় আসার পর পরই বিজেপি নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। এরপর চলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বুলডোজার। তবে, এর বিরুদ্ধে চলে বিক্ষোভ। কিন্তু, বিক্ষোভে পিছু হটছে না বিজেপি সরকার। উচ্ছেদ অভিযানে বুলডোজার চালানো কথা জানিয়েছে তারা। খবর ইন্ডিয়া টুডের।
প্রতিবেদনে ভারতীয় গণমাধ্যমটি জানায়, উচ্ছেদ অভিযান আরও জোরদার করেছে শুভেন্দুর বিজেপি সরকার। রাজ্যজুড়ে রাস্তায় নামানো হয়েছে বুলডোজার, যা কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকায় অবৈধ স্থাপনা লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। গত শনিবার গভীর রাতে হাওড়া ও শিয়ালদহ রেলস্টেশন এলাকায় বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়, যা রবিবার ভোরে শেষ হয়।
শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী দিলিপ ঘোষ বলেছেন, অবৈধ নির্মাণ ও দখলদারির বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত দমন অভিযানের কেবল শুরু। তিনি পুরো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বুলডোজার চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আইন মেনে চলার জন্য জনগণকে আহ্বান জানিয়ে খড়গপুর সদর বিধায়ক দিলিপ বলেন, “নতুন সরকার প্রথম দিন থেকেই এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সরকারি জমিতে কোনও ধরনের দখলদারি আমরা সহ্য করবো না।”
অবৈধ দখলদারি বিরোধী অভিযানের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠেছে কলকাতা
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার অন্যতম রাজনৈতিক এবং নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে দখলদারি। ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে গড়ে ওঠেছে অবৈধ দোকান। পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণ ও দোকান সম্প্রসারণ নাগরিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিজেপি সরকারের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনকালে অবৈধ কাজকর্মে সহায়তা ও প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি দখলবাজি দেখা যাচ্ছে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনের আশপাশে, যা ভারতের সবচেয়ে বড় এবং ব্যস্ততম দু’টি পরিবহন কেন্দ্র।
এই দুই স্টেশনের আশেপাশের এলাকায় রাস্তা দখল করে বিভিন্ন ভাসমান দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকানের অনেকগুলোই বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে সেখানে পরিচালিত হচ্ছে। এই অবৈধ দখলদারি প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাথগুলোকে সংকুচিত করে ফেলছে, যার ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে, যা ইতোমধ্যে যানজটে ভোগা রাস্তাকে আরও বিপাকে ফেলছে।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায়, কলকাতার পার্ক সার্কাস, গড়িয়াহাট, এসপ্ল্যানেড, বড়বাজার এবং টপসিয়া এলাকাতেও। এসব এলাকায় অনুমোদনহীন বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও অবৈধ স্থাপনা বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণের স্থান দখল করে প্রসারিত হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে নগর পরিকল্পনাবিদরা সতর্ক করে বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন দখলদারি ও অবৈধ নির্মাণ যানজট বাড়ায়, পুরোনো অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। বিজেপি প্রশাসন বলছে, তারা কলকাতা এবং সমগ্র পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বুলডোজার ও উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে পুরোনো প্রথা ভেঙে ফেলতে চায়।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন কলকাতার টপসিয়া-তিলজলা এলাকায় একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে, যা শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন কেন্দ্র।
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এর আগে গার্ডেনরিচ, মেটিয়াবুরুজ, রাজাবাজার, বড়বাজার, টপসিয়া-তিনজলা এবং ইএম বাইপাস এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। রেড জোন বলতে বোঝায়, এমন একটি এলাকা যেখানে প্রচুর অবৈধ নির্মাণ রয়েছে এবং যেগুলো ভাঙার জন্য নির্ধারিত।
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের এক কর্মকর্তা দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানান, টপসিয়া-তিলজলা এলাকায় এক হাজারেরও বেশি স্থাপনা ভাঙার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গত দশকে নির্মিত স্থাপনাগুলোর অন্তত ৭০ শতাংশই অবৈধ।
টপসিয়া-তিলজলা এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশ ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্সের নিরাপত্তায় সেখানে এক্সক্যাভেটর ও বুলডোজার ঢুকে কাজ শুরু করে। এই ঘটনা ঘটে অবৈধ চামড়া কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের একদিন পর, যেখানে দু’জনের মৃত্যু হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এবং কলকাতাজুড়ে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ ঘোষণা করেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় বুলডোজার ও এক্সক্যাভেটর কাজ শুরু করলেও গত শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজা বাসু চৌধুরী ২২ জুন পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধের দেন। ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দা আদালতে অভিযোগ করেন, তাদের কোনও নোটিশ না দিয়েই উচ্ছেদ করা হয়েছে।
হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান
গত শনিবার গভীর রাতে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে বড় আকারের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এতে পাঁচ শতাধিকের বেশি হকার ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই স্টেশন দুটি দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেলস্টেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেনে যাতায়াত করেন।
দিলিপ ঘোষ বলেন, “শুধু হাওড়া স্টেশন নয়, বাংলার প্রতিটি স্টেশনই বাজারে পরিণত হয়েছে। সব জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে আছে। নারী, শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক—কারও বসার মতো জায়গা নেই। রেলওয়ে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করবে এবং তা জনগণের সেবায় ব্যবহার করবে।”
হাওড়ায় রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী, সরকারি রেল পুলিশ, রেল কর্তৃপক্ষ এবং হাওড়া সিটি পুলিশের যৌথ উদ্যোগে গত শনিবার এই অভিযান পরিচালিত হয়। গঙ্গা ঘাট থেকে হাওড়া স্টেশন চত্বর পর্যন্ত এলাকাজুড়ে বুলডোজার ও এক্সক্যাভেটর দোকান ও অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলে।
কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, এই অভিযানে দেড়শটির মতো অস্থায়ী দোকান এবং রাস্তার পাশের স্টল উচ্ছেদ করা হয়েছে। হাওড়া স্টেশন এলাকা থেকে প্রায় ২০০ হকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে খাবার, ফল, খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রেতারা ছিলেন।
হাওড়ায় কিছু হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা এবং পুলিশের সঙ্গে ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিপুল পুলিশ মোতায়েনের কারণে শেষ পর্যন্ত অভিযান থামানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
একই সময়ে শিয়ালদহ স্টেশনের এক থেকে ২১ নাম্বার প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত থাকা হকার ও অস্থায়ী দোকানগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অভিযানে ২৫০ জন হকার ও দোকানদারকে স্টেশন চত্বর থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
অন্যদিকে, পূর্ব রেলওয়ে গত সপ্তাহে দক্ষিণ কলকাতার ব্রেস ব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশে বসবাসকারী বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা করেছিল। তবে, আদালতের হস্তক্ষেপের জেরে পরে এই অভিযান পরে স্থগিত করা হয়।