মঙ্গলবার ১৬ই জুন, ২০২৬

দাম কম, একসঙ্গে মিলছে সব জাতের আম ক্রেতা খুশি হলেও দুশ্চিন্তায় চাষি

মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগের জন্য অপেক্ষা, তারপর হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি কিংবা হাড়িভাঙা-প্রতিটি জাতের আমের জন্য ছিল আলাদা সময়। ক্রেতারাও জানতেন, কোন মাসে কোন আমের রাজত্ব। কিন্তু এবার যেন সেই পরিচিত ছন্দটাই বদলে গেছে। সব আমই মিলছে একই সময়ে।

আম ব্যবসায়ী ও চাষিরা বলছেন, অস্বাভাবিক গরমে আমের পরিপক্ব হওয়ার স্বাভাবিক সময়সূচি এলোমেলো হয়ে গেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরাসহ দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো থেকে যে আমগুলো ধাপে ধাপে বাজারে আসার কথা ছিল, সেগুলোর বড় একটি অংশ প্রায় একই সময়ে পেকে গেছে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ আম ঢুকতে শুরু করে চট্টগ্রামের বাজারে। একসঙ্গে মিলছে আম্রপালি, হিমসাগর, বারি-৪, ল্যাংড়া, হাড়িভাঙাসহ প্রায় সব জনপ্রিয় জাতের আম।

এদিকে এবার পার্বত্য জেলাগুলোতে লিচুরও ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকেও এসেছে প্রচুর লিচু। তুলনামূলক কম দামে লিচু পাওয়ায় অনেক ক্রেতা ফলটির দিকেও ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে প্রায় সব জাতের আম একই সময়ে বাজারে চলে আসায় সরবরাহ বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমের দামও অনেক কম।

এই পরিস্থিতি যেমন স্বস্তি দিচ্ছে ক্রেতাদের, তেমনি বাড়িয়ে দিচ্ছে চাষিদের উৎকণ্ঠা। পছন্দের আম বেছে নেওয়ার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি কম দামের কারণে ইচ্ছেমতো খেতেও পারছে মানুষ। কিন্তু একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে চলে আসায় সরবরাহ বেড়েছে, অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি চাহিদা। দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

গত কয়েকদিন নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, রেয়াজউদ্দিন বাজার, কর্ণফুলী মার্কেট থেকে শুরু করে অলিগলির ভ্রাম্যমাণ ফলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে একসঙ্গে বিক্রি হচ্ছে হিমসাগর, আম্রপালি, বারি-৪, ল্যাংড়া, ব্যানানা ম্যাংগোসহ প্রায় সব জাতের আম। দামও এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। ভালো মানের প্রায় সব জাতের আম মিলছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০টাকার মধ্যে। অথচ অন্যান্য বছর একই আম কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হয়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।

চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে বেশিরভাগ আম সরবরাহ করা হয় ফলের রাজ্যখ্যাত স্টেশন রোডের ফলমণ্ডি থেকে। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাকে ট্রাকে ঢুকছে বিভিন্ন জাতের আম।

ফলমণ্ডির রেলওয়ে মেনস সুপার মার্কেটের মেসার্স আল্লাহর দয়া স্টোরের মালিক সাহাবউদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, ‘গরমের কারণে প্রায় সব জাতের আম একই সময়ে পেকে গেছে। সেজন্য বাজারে এবার সব জাতের আম একসঙ্গে মিলছে। আবার এই অঞ্চলে এবার লিচুও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়েছে। এই দুই কারণেই আমের দাম অনেক কম।’

প্রায় একই কথা বললেন মেসার্স সায়েম এন্ড সাইফা এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী মো. সুমন। তিনি বলেন, ‘এখন বাজারে বেশি আসছে আম্রপালি আর হাড়িভাঙা। পাইকারিতে আম্রপালি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং হাড়িভাঙা ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় মিলছে। অন্যান্য বছর এসব আম ৬০ থেকে ৭০টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।’

চট্টগ্রামের ফল ব্যবসায়ীরা জানান, আম বেশিদিন সংরক্ষণ করার সুযোগ নেই। বাজারে এনে দ্রুত বিক্রি করতে না পারলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেক ব্যবসায়ী কম লাভে হলেও দ্রুত বিক্রি করে দিচ্ছেন। কম দামে আম কিনতে পেরে খুশি নগরবাসী। বহদ্দারহাটে আম কিনতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম জিয়া বলেন, ‘আগে এক কেজি কিনতাম। এখন একই টাকায় দুই কেজি কেনা যাচ্ছে। পরিবার নিয়ে আম খাওয়ার সুযোগ বেড়েছে।’

তবে আমের দাম ক্রেতাদের মুখে হাসি ফোটালেও চাষিদের চেহেরা মলিন করে দিয়েছে। খাগড়াছড়িতে এবার ভালো ফলন হয়েছে আম্রপালি আমের। মিষ্টি স্বাদ ও আকর্ষণীয় রঙের কারণে খাগড়াছড়ির আম্রপালির ভালোই চাহিদা থাকে বাইরের জেলাগুলোয়। কিন্তু পাইকারিতে এবার আকারভেদে আম্রপালি আম বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০-৫০ টাকায়। অথচ আগের বছর বিক্রি হয়েছিল ৬০ থেকে ১০০ টাকায়।

তাই পানছড়ির নালকাটা এলাকার চাষি হীরাধন চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আম উৎপাদনে সারা বছর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু মৌসুমে যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তাহলে এত কষ্টের কোনো মূল্য থাকে না। এবার আমের যা দাম, তাতে খরচই ওঠবে না।’তাই মৌসুমের রাজা এবার যেন দুই বিপরীত অনুভূতির নাম। একদিকে কম দামে আম নিয়ে ঘরে ফিরছেন ক্রেতারা, অন্যদিকে সেই আমের মিষ্টি গন্ধে চাপা পড়ে যাচ্ছে চাষিদের দীর্ঘশ^াস।

Translate