ট্যালেন্ট হান্ট নেই, নেই পরিকল্পনাও

১১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল সিজেকেএস সুইমিং কমপ্লেক্স। লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা আয়োজন, দক্ষ সাঁতারু তৈরি এবং দেশের সাঁতার অঙ্গনে চট্টগ্রামকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়া। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধনের পর জাতীয় ও ঘরোয়া পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলেও সাত বছরে এই আধুনিক সুইমিংপুল একজনও জাতীয় মানের সাঁতারু উপহার দিতে পারেনি। অথচ এই সময়ে প্রায় ৫০ হাজার শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী এই সুইমিংপুলে সাঁতার শিখেছে।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ জন (১০০ জন ছেলে ও ৪০ জন মেয়ে) প্রশিক্ষণ নিলেও কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে মূলত সাঁতার শেখানোর মধ্যেই। প্রতিভা অন্বেষণ, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, নিয়মিত প্রতিযোগিতা কিংবা সাঁতারু গড়ে তোলার কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড, ফ্লাডলাইট ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ঘাটতি। ফলে কোটি টাকার এই স্থাপনা বাণিজ্যিকভাবে সচল থাকলেও মূল উদ্দেশ্য-জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সাঁতারু তৈরি-আজও অধরাই রয়ে গেছে। সাবেক জাতীয় সাঁতারু ও ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, প্রতিভাবানদের বাছাই, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই সম্ভাবনাকে থামিয়ে রেখেছে।

যে কেউ চাইলে ভর্তি হতে পারেন ৩১০০ টাকার বিনিময়ে, নির্ধারিত ১৬টি সেশনে একজন প্রশিক্ষণার্থীর কোর্স সম্পন্ন হয়। সকাল ৭টা থেকে ১টা পর্যন্ত ৪টি সেশনে মেয়েদের ২ জন নারী ট্রেইনার ও ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সমান ৪টি সেশনে ৩ জন পুরুষ ট্রেইনার শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ছেলে ও মেয়েদের পৃথক অনুশীলন সূচি থাকলেও ৫ জন ট্রেইনার যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিমত আরও অন্তত দু’জন ট্রেইনার থাকলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গতি পেতো। সুইমিংপুলের রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পারিশ্রমিক মিলিয়ে প্রতিমাসে খরচ হয় প্রায় ৪ লাখ টাকা। প্রশিক্ষণার্থীদের ভর্তি ফি বাবদ আয়ে সিজেকেএস ফান্ডে উদ্বৃত্ত থাকলেও সেটা সাঁতারু তৈরিতে কোন কাজেই আসছে না, বলা যায় কাজে লাগানো হচ্ছে না।

প্রতিষ্ঠার পর একবারও সংস্কারের মুখ না দেখা পুলের ‘আন্তর্জাতিক’ মানও এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ, শুরু থেকেই এই পুলের অবকাঠামোতে অস্তিত্ব ছিল না ইলেক্ট্রনিক্স স্কোরবোর্ড ও ফ্লাড লাইট। পুলের পানি গরম করার কোন ব্যবস্থা না থাকায় শীতকালে ব্যবহারের জন্যও উপযুক্ত নয়। সমস্যা আছে পানি ফিল্টারকরণেও।

বাণিজ্যিক ব্যবহারে সফল হলেও সিজেকেএস বা সাঁতার ফেডারেশন সাঁতারু তৈরির কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না কেন, এই প্রশ্ন সবার। এদিকে সর্বশেষ, সাঁতার ফেডারেশনে যে এডহক কমিটি গঠন করা হলো, তাতেও নেই চট্টগ্রামের কোন প্রতিনিধি। যোগ্য সংগঠক ও সাবেক সাঁতারু থাকলেও সাঁতারের এডহক কমিটি চট্টগ্রাম শুন্য থাকা নিয়ে প্রতিদিনই স্টেডিয়াম পাড়ায় হয় সরব আলোচনা।
চট্টগ্রামের সাঁতার ও সিজেকেএস সুইমিং কমপ্লেক্সের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয় সাবেক জাতীয় সাঁতারু ও বর্তমানে সিজেকেএস সাঁতার উপ-কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সাগর, সিজেকেএস কাউন্সিলর ও সিজেকেএস সাঁতার কমিটির সাবেক সম্পাদক রায়হান উদ্দিন রুবেল, সিজেকেএস সাবেক নির্বাহী সদস্য ও কল্লোল সংঘের সহ-সভাপতি নাসির মিঞা এবং সিজেকেএস কাউন্সিলর ও সিডিএফএ নির্বাহী সদস্য সাইফুল আলম খানের সাথে। সকলেই বললেন, অপার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নিয়মিত সাঁতার শিক্ষা কার্যক্রম বাদে পুলটি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন ও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা (সিজেকেএস), এই তিনটি সংস্থা ও ফেডারেশন কার্যকর উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসবে প্রতিভাবান সব সাঁতারু।

মাহবুবুর রহমান সাগর বলেন, পুলটি তৈরি হয়েছিল প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য, শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য নয়। তবে এটাও সত্য, চট্টগ্রামে জেলা উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু-কিশোরের দুঃখজনক মৃত্যু রোধে চলমান শিক্ষা কার্যক্রম দারুণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিযোগিতাও যে হচ্ছে না তাও নয়। চলমান শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ট্যালেন্ট হান্ট করে তাদের জন্য একটি বিশেষ স্লট করে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষ সাঁতারু বের হয়ে আসবে। একইসাথে পুলটির বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ডিপ টিউবওয়েল থেকে সরাসরি পানি এসে পুলে জমা করা হয়। পুলেই সেই পানিকে কেমিকেলের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করা হয়। অথচ প্রক্রিয়াটি হওয়ার কথা ছিল প্রথমে পানি যাবে রিজার্ভারে, তারপর পুলে। এছাড়া দুটি মোটর থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে একটি নষ্ট পড়ে আছে। নেই ইলেক্ট্রনিক স্কোরবোর্ড ও ফ্লাডলাইট। সমস্যা আছে স্টার্টিং পয়েন্টেও। এছাড়া, সাঁতার শেখানোর জন্য পুলের পানি কখনও ৪ ফুটের বেশি বাড়ানো যায় না, ফলে পুলের দেয়ালেও সমস্যা হচ্ছে। শেখানো কার্যক্রম নিয়মিত চালাতে হলে পুলে ৪ ফুট স্তরে পানি নিকাশের পৃথক একটি ব্যবস্থা করা জরুরি। সবমিলিয়ে গ্যালারি থেকে শুরু করে সার্বিক সংস্কারে প্রায় ২ কোটি টাকার প্রয়োজন। সাঁতারু উঠে আসছে না কেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখান থেকে সাঁতারু তুলে আনতে হবে এমন পরিকল্পনাই দৃশ্যমান নয়। আমরা যদি গত একবছরের মতো নির্দিষ্ট একটি স্লট (প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে ৬টা, যা এখন নেই!) শুধু প্রতিভাবানদের বিনামূল্যে অনুশীলনের জন্য পেতাম তাহলে সাঁতারু বেরিয়ে আসতো।

সাঁতারে চট্টগ্রামের দারুণ সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন রায়হান উদ্দিন রুবেল। সিজেকেএস সাঁতার কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসাবে স্বল্পমেয়াদের দায়িত্বকালে রুবেল জেলা উপজেলায় ঘুরে দেখেছেন, বিশাল সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে চট্টগ্রামের জেলা উপজেলায়। কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া বা দেশের অন্য কিছু জেলা পুকুরে বা উন্মুক্ত জলাশয়ে সাঁতার কেটে জাতীয় সাঁতারু পেলেও চট্টগ্রামে একটি আধুনিক পুল থাকার পরও সাঁতারু তৈরিতে ব্যর্থ চট্টগ্রাম। এই ব্যর্থতা আমাদের। তিনি যোগ করেন, সাফল্যের জন্য উপজেলাগুলোর দিকে নজর দিতেই হবে। ২০২২/২৩ মৌসুমে এমনই একটি কার্যক্রম বোয়ালখালী ও সন্দ্বীপ উপজেলায় চালাতে পারলেও সেটি সম্পন্ন করা যায়নি। উপজেলা পর্যায়ে ট্যালেন্ট হান্ট করে এই পুলে নির্দিষ্ট একটি সময় স্লটে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে উপকৃত হবে চট্টগ্রাম। এখানে উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় একমাত্র বোয়ালখালীতেই রয়েছে সাঁতার শেখানোর জন্য সুইমিংপুল।

জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সাঁতারে মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানান নাসির মিঞা। তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রচুর প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র সাঁতার না জানার কারণে। অভিভাবকদের একটু বাড়তি সচেতনতা যেমন শিশুদের সাঁতারে আগ্রহী করে জীবন বাঁচাতে পারে তেমনি সিজেকেএস সুইমিং কমপ্লেক্স সংশ্লিষ্টরা যদি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে দুটি স্লট সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারেন তাহলে সাঁতার জানা শিশু কিশোরের সংখ্যাও বাড়বে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা কিংবা নগরীতে বসবাস করছেন (এনআইডি কার্ডে ঠিকানা চট্টগ্রাম) তাদের শিশু সন্তানদের নিজ নিজ এলাকার কাউন্সিলরদের অনুমোদন নিয়ে সিজেকেএস’র ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিনামূল্যে সাঁতার শেখানোর কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার অনুরোধ জানান কল্লোল সংঘের সহ-সভাপতি।

সাইফুল আলম খান কিন্তু দারুণ আশবাদী, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এই চট্টগ্রাম হয়ে উঠতে পারে দেশের সাঁতারের হাব। নগরায়নের এই সময়ে চট্টগ্রামে উন্মুক্ত জলাশয় দিন দিন কমলেও এখনও নগরীর বিভিন্ন স্থানে টিকে থাকা পুকুরে শিশু-কিশোররা দাপিয়ে বেড়ায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও জলাশয় টিকিয়ে রাখা ব্যবহারের উপযোগিতায় দারুণ কাজ করছে। এই দিক থেকে আজকের কিশোর-তরুণদের প্রযুক্তি পণ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করে তাদের মাঠে বা পুলে আনা গেলে ক্রীড়া দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। এজন্য সবার আগে ভূমিকা রাখতে হবে অভিভাবকদের, সাথে ক্রীড়া সংগঠকরা সেই তরুণদের জন্য পরিচ্ছন্ন খেলার পরিবেশ উপহার দেয়ার দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করবেন। তিনি যোগ করেন, পুকুরে ডুবে করুণ মৃত্যুরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে সিজেকেএস সুইমিং কমপ্লেক্স। এরসাথে পরিকল্পিত উপায়ে ট্যালেন্ট হান্ট ও টুর্নামেন্ট নিয়মিত করা গেলে সাঁতারু তৈরিতেও আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে এই সুইমিংপুল।

Translate