শুক্রবার ১লা মে, ২০২৬

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ: বাস্তবায়ন কতদূর

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু দৃশ্যত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থমকে আছে। আইনি জটিলতা, আদালতে মামলা, কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকা, বিদ্যমান ক্যাডার বৈষম্য, আন্তমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় অভাব ও বাজেট বরাদ্দে জটিলতাসহ নানা সুপারিশগুলোর বেশিরভাগের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে আছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কয়েকটি সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসবের কাজও চলছে ধীরগতিতে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

কমিশনের যেসব সংস্কার প্রস্তাব প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় নিজ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত ২৫ মে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠায়। কিন্তু সেই কাজটিও সেভাবে আগায়নি।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরো প্রশাসন এখন নির্বাচনের অনুকূলে মাঠ গোছানোর কাজে ব্যস্ত। ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ব্যস্ত সময় পার করছে— ডিসি, এসপি, ইউএনও ও বিভাগীয় কমিশনার পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নের কাজে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকারের মাথায় এখন একটাই টার্গেট আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। তিনি বলেন, ‘কোনও শক্তি সরকারকে এই টার্গেট থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।’ এমন পরিস্থিতিতে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে এই মুহূর্তে মাথা ঘামানোর সুযোগ নাই প্রশাসনের।

ফিফটি-ফিফটি পদোন্নতি ও চার প্রদেশ

এছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের দেওয়া দুই শতাধিক সুপারিশের মধ্যে বেশিরভাগই বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সুপারিশ অনুযায়ী পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ও অন্য ক্যাডার বা প্রস্তাবিত সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ফিফটি-ফিফটি (৫০:৫০) পদোন্নতির বিষয়টি আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর দেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করে প্রাদেশিক সিস্টেমে গেলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে স্বাধীনতা আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে এটার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া প্রাদেশিক সিস্টেম চালু করতে কয়েক লাখ কোটি টাকার দরকার। সেই সামর্থ্য রাষ্ট্রের নেই। শুধু তাই নয়, প্রদেশ বা সিটি গভর্নমেন্ট করলে মাথাভারী প্রশাসন এবং সরকারের কলেবর বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, স্বাধীন জনপ্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের খবরদারি শূন্যের কোঠায় নিয়ে এলেই বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। আর ক্যাডারগুলো ভেঙে ছোট করা হলে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। এছাড়া পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি পদ্ধতি বাস্তবায়ন হলে সবাই পরীক্ষার পেছনে পড়ে থাকবে। এতে জনসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। শুধু তাই নয়, সব সুবিধাসহ ১৫ বছর চাকরি করার পর অবসরের সুপারিশের বিরোধিতা করছেন তারা। এ অবস্থায় কবে নাগাদ এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা জানেন না কেউই।

ডিসি ও ইউএনও পদের নাম পরিবর্তন

জানা গেছে, একইসঙ্গে জনসংস্কার কমিশনের কমিশনের সুপারিশে ডিসি ও ইউএনও পদের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশে বলা হয়, জনপ্রশাসনের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা, স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনে দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পদবি পরিবর্তন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিসি’র নতুন পদবি হবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা কমিশনার (ডিসি) এবং ইউএনও’র নতুন পদবি হবে উপজেলা কমিশনার। এছাড়া, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর পদবি পরিবর্তন করে অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (ভূমি ব্যবস্থাপনা) করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, পদবি পরিবর্তন করে জনসেবা নিশ্চিত করা যায় না।

৮ প্রস্তাব বাস্তবায়ন কতদূর?

সূত্র জানায়, এর বাইরে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। গত ১৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এগুলো বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ৮টি অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব বলেও আলোচনা হয়। এগুলো হলো—মহাসড়কের পেট্রল পাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট-সংক্রান্ত, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটকে ডায়নামিক করা, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা, গণশুনানি, তথ্য অধিকার আইন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পুনর্গঠন এবং ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা। এই ৮টি সুপারিশও বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিভিন্ন পেট্রলপাম্প ও সিএনজি মালিক সমিতির সঙ্গে মতবিনিময় ও বৈঠক করে নির্দেশনা জারি করবে এবং জেলা প্রশাসনকে তা বাস্তবায়ন ও তদারকির অনুরোধ জানাবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও জেলা প্রশাসকদের এ বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করবে। তবে এ কাজটি এখনও শতভাগ বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ ছাড়া আগে থেকেই মহাসড়কের পাশে অবস্থিত পেট্রলপাম্পগুলোতে পাবলিক টয়লেট রয়েছে।

শুরুতে বলা হয়েছিল, মন্ত্রণালয়ের ওয়েববসাইটকে ডায়নামিক করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এক সপ্তাহের মধ্যে সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সভা করে ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তথ্য আপলোড এবং নাগরিকদের মতামত প্রদানের অপশন রাখার বিষয়ে করণীয় ঠিক করে দেবে। এটির সঙ্গে বাজেট বরাদ্দ সম্পর্কিত থাকায় কাজটি আটকে গেছে। অপরদিকে, সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন করার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ দুই দিনের মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সুপারিশ করার কথা থাকলেও তা এগোয়নি। বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, এনজিওবিষয়ক ব্যুরোসহ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যে সভা করে কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করার কথা ছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনও কাজ শুরু করতে পারেনি। অতি শিগগির শুরু করার সম্ভাবনাও নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সব সরকারি দফতরে নির্দিষ্ট বিরতিতে গণশুনানি নিশ্চিত করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক সপ্তাহের মধ্যে সব সেবা প্রদানকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে গণশুনানির কৌশল ঠিক করে দেওয়ার সুপারিশ থাকলেও তা শতভাগ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ পর্যালোচনা ও সংশোধনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান কমিশন’ হিসেবে রূপান্তরের সুপারিশ করেছিল কমিশন। বলা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলমান সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে কমিশনের সুপারিশ সমন্বয় করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পুনর্গঠন করতে হবে। এ কাজটি করার কথা ছিল পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের। তবে এ বিষয়ে কোনও কাজ শুরু হয়েছে কিনা, তা জানাতে পারেনি কেউ।

ডিজিটাল রূপান্তর সম্পন্ন করা এবং ই-গভর্নমেন্ট ও ই-সার্ভিস ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজও সেভাবে এগোয়নি।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক একজন কেবিনেট সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কমিশনের অনেক সুপারিশই গায়েবি সুপারিশ বলে মনে হয়। তিনি বলেন, এগুলোর বেশিরভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এছাড়াও বিষয়টি যেমন সময় সাপেক্ষ, তেমনই ব্যয়বহুল। সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ থাকে কম। তাই কম সময়ের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, কমিশনের অনেক সুপারিশ রয়েছে, যা বাস্তবায়নের জন্য সংসদের অনুমোদন লাগে। যেহেতু সংসদ নেই সেহেতু এগুলো বাস্তবায়ন অসম্ভব।

এ প্রসঙ্গে সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়নের কাজ সরকারের। সরকার তার সাধ্য, সামর্থ্য ও সময় অনুযায়ী সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। সব যে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে, তেমন কোনও নির্দেশনা আমাদের পক্ষ থেকেই নেই। সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে কিনা, বা কবে করবে— সেটিও তাদের বিষয়।’

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখলেস উর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এসব নিয়ে কাজ করছে।’

Translate