বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬

‘ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম ঋণখেলাপি নন, খেলাপি ঋণ স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের’

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে ঘিরে ঋণখেলাপির অভিযোগ নিয়ে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন; বরং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণ খেলাপি হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান, যার যৌথ মালিকদের একজন খুরশীদ আলমের স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে ওই ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। তবে এই কারণে খুরশীদ আলমকে ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়।”

আরিফ হোসেন খান বলেন, “খুরশীদ আলমের স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়েছে। কিন্তু খুরশীদ আলম নিজে ঋণগ্রহীতা নন এবং ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপিও নন। এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।”

পুরোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও আলোচনায়

খুরশীদ আলমকে ঘিরে সম্প্রতি তার চাকরি জীবনের একটি পুরোনো ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর কার্যালয়ে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কৌশলে ৫৪ লাখ টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এই অভিযোগের তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ একটি অফিস আদেশ জারি করে। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস-২০০৩-এর ৪৪(১)(বি) ধারা অনুযায়ী তার দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত করা হয়।

তবে এই বিষয়ে বর্তমানে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, “সেই সময় খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিষয়টি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তার বিরুদ্ধে দেওয়া শাস্তি যথাযথ ছিল না। এই কারণেই তিনি পরবর্তী সময়ে নির্বাহী পরিচালক এবং পরে ডেপুটি গভর্নর পদে পদোন্নতি পান।”

নিয়োগের সিদ্ধান্তে অনড় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগ নিয়ে চলমান বিতর্ক ও আন্দোলনের প্রসঙ্গেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আরিফ হোসেন খান বলেন, “চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে তারা সঠিক মনে করে। কোনও ধরনের আন্দোলন, চাপ বা দাবি-দাওয়ার মুখে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রশ্নই আসে না।” তার ভাষায়, “আজ যদি একটি পক্ষের আন্দোলনের কারণে কোনও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য কোনও পক্ষ আরও বড় আন্দোলন করে আরেকটি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি তুলবে। এভাবে কোনও প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারে না।”

অনলাইন পর্ষদ সভার অনুমতির ব্যাখ্যা

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভার্চুয়াল সভা আয়োজনের অনুমতি নিয়েও সম্প্রতি নানা আলোচনা তৈরি হয়। এই বিষয়ে মুখপাত্র জানান, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে অনলাইনে পর্ষদ সভা আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অনুমোদন দিয়েছে।

তিনি বলেন, “বিশেষ পরিস্থিতিতে পরিচালনা পর্ষদের সভা ভার্চুয়ালি আয়োজনের সুযোগ রয়েছে এবং এই ধরনের সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধ নেই।”

বিতর্ক অব্যাহত

উল্লেখ্য, অতীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়া এবং সাম্প্রতিক ঋণখেলাপির অভিযোগ— দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই খুরশীদ আলমকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তার নিয়োগের পর পুরোনো অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে আসে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন এবং তার বিরুদ্ধে প্রচারিত তথ্যের একটি অংশ বিভ্রান্তিকর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, বাস্তব তথ্য তুলে ধরে এই বিষয়ে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন।

এদিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ, পুরোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ঋণখেলাপির অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং খুরশীদ আলমের নিয়োগকে যথাযথ ও যৌক্তিক বলেই মনে করছে।

Translate