বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬

ইরানে মুদ্রাস্ফীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পর্যায়ে, অর্থনৈতিক সংকট কতটা তীব্র

ইরানে মে মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর দেখা যায়নি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে এই পরিস্থিতি সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এ বিষয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মে মাসেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমাদের নিশ্চিতভাবেই আরও উচ্চ মূল্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা লড়াই করছি এবং আমাদের অবশ্যই এই কষ্ট মেনে নিতে হবে।’

নতুন করে যুদ্ধ শুরুর অনিশ্চয়তা

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি মূলত সেই বাস্তবতার প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যা দেশটির সাধারণ মানুষ কেনাকাটা করতে গিয়ে, ট্যাক্সি ভাড়া দিতে বা চিকিৎসা ক্লিনিকে গিয়ে ইতোমধ্যে টের পাচ্ছেন। মার্কিন নৌ-অবরোধের মধ্যে থাকা ইরানের তেল-নির্ভর অর্থনীতিকে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সরকারি দুর্নীতিও পেছনের দিকে টেনে ধরছে। যুদ্ধের কারণে ইরানের মুদ্রা রিয়াল চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যুদ্ধ নতুন করে শুরুর অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

এই চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ফারারু নিউজ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক ভিডিওতে বিশ্লেষক মহসেন জলিলবান্দ বলেন, ‘আমার কোনও সন্দেহ নেই যে ট্রাম্প যদি কোনও শান্তি চুক্তি ছাড়া চলে যান… তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে আগামী গ্রীষ্মের শেষের দিকে আমরা সম্ভবত গত জানুয়ারির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি।’

মুদ্রাস্ফীতি কতটা তীব্র

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পণ্য ও সেবামূল্য পরিমাপক ভোক্তা মূল্যসূচক গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে ৭৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটি আরও জানায়, এই হার গত এপ্রিল মাসের চেয়ে ৮.৫ শতাংশ বেশি। ওষুধ, ট্যাক্সি ভাড়া, তামাক এবং যোগাযোগ ব্যয়ের মতো দৈনিক ও সাধারণ প্রয়োজনীয় খাতের মুদ্রাস্ফীতি আগের বছরের চেয়ে ১১৩.৮ শতাংশ বেড়েছে।

এর আগে ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইরান এর চেয়েও ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখেছিল। সে সময় ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরান আক্রমণ করে দেশটির রেল ব্যবস্থা দখল করে নিলে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। দুর্বল ফসলের কারণে সৃষ্ট সেই খাদ্যসংকট তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষের জন্ম দেয়। ক্ষুধা ও টাইফাসের প্রাদুর্ভাবে তখন বহু মানুষ মারা গিয়েছিল।

ইরানের একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বামদাদ ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক স্টাডিজ বর্তমানের এই পরিসংখ্যানকে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নজিরবিহীন হার’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পরিসংখ্যানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যের বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

ইরান-মার্কিন যৌথ হামলার প্রভাব

চলতি বছরের বিমান হামলাগুলো ইরানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং তেল শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন নৌ-অবরোধের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া, যা দেশটির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। লড়াই সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করায় কর রাজস্ব কমে গেছে। ২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার ছিল ৩২ হাজার, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ রিয়ালের বেশিতে।

সংকট থেকে নতুন বিক্ষোভ শুরুর শঙ্কা

অতীতেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে খাবারের দাম বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভে ২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং শত শত মানুষ গ্রেফতার হন। এরপর সরকারি ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এরপর চলতি বছরের শুরুতে রিয়ালের দরপতনের কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভ ছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির সবচেয়ে তীব্র আন্দোলন।

অ্যাক্টিভিস্টদের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।

তেহরানভিত্তিক অর্থনীতিবিদ সাঈদ লেইলাজ বার্তা সংস্থা এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৮০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের সমাজ ২৫ শতাংশের বেশি বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি সহ্য করতে পারে না।

বর্তমানে দেশটির কট্টরপন্থিরা মনোবল চাঙ্গা রাখতে বন্দুক চালনা কর্মশালা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ছায়ায় বিয়ের আয়োজন করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানুষ যদি তাদের পরিবারের খাবার জোগাতে ব্যর্থ হয়, তবে যেকোনও সময় নতুন করে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠতে পারে।

সূত্র: এপি

Translate