চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় গ্রামের আলোচিত শিশু মো. রায়হানকে ভিক্ষাবৃত্তি করানোর উদ্দেশে রাজধানীর একটি চক্র তার একটি পা কেটে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে এবার অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার জন্য নয়, বরং রাজধানীতে ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তেই রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। একই সঙ্গে রায়হান ও তার পরিবারকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যেও দেখা গেছে অসঙ্গতি, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ঢাকা রেলওয়ে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আল আমিন নামে এক যুবকের সঙ্গে লাভের অংশ ভাগাভাগির ভিত্তিতে পানি বিক্রি করত। পাশাপাশি সে ভিক্ষাও করত। চলতি বছরের ১১ জুন বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুরে ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় সে।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য পরে জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অস্ত্রোপচারের পর প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে ছিল রায়হান। এ সময় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তার পরিচর্যার জন্য আরেছা নামের একজন আয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পর সে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের জরিনা নামের এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয়। স্টেশনে যিনি ‘মালির মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর সেখানেই ভিক্ষা করত রায়হান।
পুলিশের ভাষ্য, একপর্যায়ে রায়হান জানায় তার মা মারা গেছেন এবং সে বাড়ি ফিরতে চায়। পরে তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে একটি বাসে তুলে দেয়। রায়হানকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিমও ভূমিকা রাখেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা। মিনা নামের স্টেশনের এক নারীও শিশুটির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে দাবি পুলিশের ওই কর্মকর্তার।
ট্রেন দুর্ঘটনার পর রায়হানকে নিয়ে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে হাসপাতালের মেঝেতে বসে থাকা রায়হানকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। একই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, তার মা-বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটেও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিল রায়হান। সে স্থানীয় একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতির সিরাত মাহফিলের মাঠে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে দেখতে পান। পরে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন পেশায় দিনমজুর। রায়হানের মায়ের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছে। বর্তমানে দুজনের আলাদা সংসার। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে রায়হান সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওকে কেন্দ্র করে তখনই অভিযোগ ওঠে, রাজধানীর কোনো চক্র তাকে ধরে নিয়ে পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়েছে।
কিন্তু রায়হান ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এ অভিযোগের সরাসরি সমর্থন পাওয়া যায়নি। বরং রায়হানের মা-বাবা, সৎমা এবং শিশুটির নিজের বক্তব্যেও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রায়হানের মা মারা গেছেন—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও বাড়িতে গিয়ে তার আপন মা ও সৎমা দুজনের সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে শিশুটির পারিবারিক পরিস্থিতি, বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকায় তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীনকে নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের কথা রয়েছে। তার দাবি, নাজিম উদ্দীন নিয়মিত মাদক সেবন করেন। রায়হানের পা কাটা অবস্থার ছবি ফেসবুকে দেখানোর পরও তিনি ছেলেকে দেখতে যাননি বলে দাবি করেন আবুল হোসেন।
অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নাজিম উদ্দীন বলেছেন, ছেলেকে উদ্ধারের পর তিনি পা কাটা অবস্থায় দেখেছেন এবং এর আগে বিষয়টি জানতেন না। এসব বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
তবে রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীনের বক্তব্যের বিভিন্ন অংশেও সময় ও ঘটনার বর্ণনায় ভিন্নতা পাওয়া গেছে। রায়হান বাড়ি থেকে কেন বের হয়েছিল, কার সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল, সেখানে কীভাবে জীবন কাটিয়েছে এবং দুর্ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও পুরোপুরি এক নয়।
এদিকে, লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ-বিন-আখন্দ বলেন, রায়হানের বিষয়টি জানার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কোনো পারিবারিক সহিংসতা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
একটি অনলাইন বার্তা সংস্থার খবর