নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে গ্রাহক প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন। আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিন বছর পর্যন্ত এ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের ফলে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়ার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নেট মিটারিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেরই নেট মিটারিং সম্পর্কে ধারণা ও প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কেউ কেউ নিজেরাই স্বীকার করেছেন, নেট মিটারিং সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে গ্রাহকের আবেদন এলেও তা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এরই একটি উদাহরণ রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী গ্রামের বাসিন্দা প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন। প্রায় দুই বছর আগে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর নোয়াপাড়া জোনাল অফিসে নেট মিটারের সংযোগ পেতে আবেদন করেন তিনি। এখনও সেই সংযোগ পাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর নোয়াপাড়া জোনাল অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পর্যায়ে নেট মিটারিং বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে একদিকে গ্রাহকদের মধ্যে নেট মিটারিং নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও অন্যদিকে বাস্তবায়নকারী পর্যায়ে প্রস্তুতির ঘাটতি সরকারের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
নেট মিটারিং কী
নেট মিটারিং হলো এমন একটি বিদ্যুৎ হিসাব ও বিলিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে গ্রাহক নিজস্ব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রথমে নিজের চাহিদা মেটান। এরপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ গ্রিডে সরবরাহ করা যায়। দ্বিমুখী মিটারের মাধ্যমে গ্রিড থেকে নেওয়া এবং গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব রাখা হয়।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় গ্রাহকের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের হিসাব মাসিক বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। সরকার ২০২৫ সালে নেট মিটারিং নির্দেশিকা হালনাগাদ করেছে।
যেভাবে কাজ করে
নেট মিটারিং ব্যবস্থায় একটি বিশেষ ধরনের দ্বিমুখী (বাই-ডাইরেকশনাল) মিটার ব্যবহার করা হয়। এই মিটার গ্রিড থেকে কত ইউনিট বিদ্যুৎ নেওয়া হয়েছে এবং গ্রিডে কত ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে, দুই দিকের হিসাব রাখে। উদাহরণ হিসেবে, কোনও কারখানায় দিনে ১,০০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো এবং ব্যবহার হলো ৭০০ ইউনিট। অতিরিক্ত ৩০০ ইউনিট জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে। পরে গ্রাহক যখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেবেন, তখন সেই অতিরিক্ত ইউনিট বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা
নেট মিটারিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যয় কমে যাওয়া। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও বড় আবাসিক স্থাপনাগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমায়
গ্রীষ্মকালে দিনে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। একই সময়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও বেশি হয়। ফলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে লোডশেডিং ও বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমায়
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।
সৌরবিদ্যুৎ কিনবে সরকার
১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেকের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের ধারাবাহিকতায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে গ্রাহক পরবর্তী তিন বছর, অর্থাৎ ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন। প্রণোদনার অর্থ গ্রাহকের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে; নগদে দেওয়া হবে না। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর স্থাপিত সিস্টেমের ক্ষেত্রে এ বিশেষ প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে না।
মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণের ঘাটতি
নেট মিটারিং সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর নোয়াপাড়া জোনাল অফিসের কর্মকর্তার বক্তব্যেও।
নোয়াপাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম মোহাম্মদ আবু ছায়েম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অফিসে নেট মিটারের জন্য কেউ আবেদন করেননি। নেট মিটার সম্পর্কে আমাদেরও স্বচ্ছ ধারণা নেই। ফলে আবেদন এলেও তা বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।’
তবে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাফ গওহার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা মেনেই নেট মিটারিংয়ের আবেদন বাস্তবায়ন করা হবে। তবে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নেট মিটারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই। তবে আমাদের সমিতির এজিএম (সদস্য সেবা) আরিফ আহমেদ নেট মিটারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।’
এ বিষয়ে আরিফ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কয়েক মাস আগে তিনি নেট মিটারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সমিতির অধীনে নেট মিটারের জন্য কোনও আবেদন পাওয়া যায়নি। আবেদন পাওয়া গেলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা হবে।
আবেদনের দুই বছরেও মেলেনি সংযোগ
রাউজানের পাহাড়তলী গ্রামের প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিনের অভিজ্ঞতা অবশ্য ভিন্ন। প্রায় দুই বছর আগে নোয়াপাড়া জোনাল অফিসে নেট মিটারের জন্য আবেদন করেও এখন পর্যন্ত সংযোগ পাননি তিনি।
গিয়াস উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করছেন। এ বিষয়ে তার প্রশিক্ষণও রয়েছে। নিজের বাড়িতে তিন কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরও দুই বছর আগে নেট মিটারের জন্য আবেদন করে এখনও সংযোগ পাননি।
তার ভাষ্য, আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাদের নেট মিটার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার এখন নেট মিটারিংয়ে উৎসাহ দিচ্ছে, তাই আবারও সংযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
যা বলছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
এদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নেট মিটারের জন্য কেউ আবেদন করলে অবশ্যই সহযোগিতা করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস সহযোগিতা না করলে আমার কাছে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি গ্রাহকদের। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাঠপর্যায়ে নেট মিটারিং বাস্তবায়নকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।’
সরকার যখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে, তখন সেই সুবিধা গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা কতটা জরুরি—চট্টগ্রামের এই চিত্র সেই প্রশ্নই সামনে আনছে।