সোমবার ২২শে জুন, ২০২৬

তৃণমূলের বিদায়ের পর প্রথম বাজেট বিজেপির

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করল বিজেপি সরকার। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর ক্ষমতায় এসে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি, এক লাখ শূন্যপদে নিয়োগ, সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প বহাল রাখা এবং নারীদের জন্য বিনা ভাড়ায় বাসযাত্রার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

রোববার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, নতুন সরকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগোতে চায়। একই সঙ্গে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।

বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা হলো রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এই বৃদ্ধি কার্যকর হবে। এর ফলে সরকারি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্তদের মোট মহার্ঘ ভাতা ৩৮ শতাংশে পৌঁছাবে। দীর্ঘদিন ধরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নতুন সরকার। অর্থমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ধাপে ধাপে এক লাখ শূন্যপদে নিয়োগ করা হবে। এসব পদের এক-তৃতীয়াংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ রাজ্যের বেকার যুবসমাজের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে। বাজেটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে।

বিরোধীদের আশঙ্কা ছিল সরকার পরিবর্তনের পর আগের সরকারের বহু জনপ্রিয় প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিদ্যমান সব সামাজিক প্রকল্প চালু থাকবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকারের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল বরাদ্দের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকারের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। নারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে বিনা ভাড়ায় বাসযাত্রা চালুর লক্ষ্যে ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ সুবিধা কার্যকর করতে শিগগিরই বিশেষ পরিচয়পত্র চালু করা হবে। সরকারের মতে, কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের নারীরা এ উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হবেন।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে বর্তমান সরকার। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।

জনপ্রতিনিধিদের উন্নয়নমূলক কাজের সুযোগ বাড়াতে বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন তহবিলের বার্ষিক বরাদ্দ ৭০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক কাজের গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাজেটে কয়েকটি বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠীর জন্যও নতুন ঘোষণা এসেছে। অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা পেনশন চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি ছিলেন এমন ব্যক্তিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থাও ঘোষণা করা হয়েছে।

বিজেপি সরকারের এই প্রথম বাজেটকে রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী শিবিরের প্রধান অভিযোগ ছিল বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাজেটে সেই প্রকল্পগুলো বহাল রাখার পাশাপাশি নতুন কিছু সুবিধা যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার জনমুখী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

অন্যদিকে বিরোধীরা ইতোমধ্যে বাজেটের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাদের দাবি, শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট একদিকে সরকারি কর্মচারী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য একাধিক সুখবর নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে রাজ্যের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কেরও সূচনা করেছে।

Translate