১৯৮৮ সাল থেকে চামড়া ব্যবসা করে আসছেন মুসলিম উদ্দিন। বাবা ও বড় ভাইয়ের হাত ধরে এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা ঐতিহ্য তুলে ধরে মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী পূর্ব পুরুষের হাত ধরে এসেছেন। পাকিস্তান আমল থেকে ব্যবসা করে আসছেন। স্বাধীনতার পরও চট্টগ্রামের ২২টি ট্যানারি ছিল। অর্থ সংকট, পরিবেশগত সমস্যা ও বিগত সরকারের ভুলনীতির কারণে চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প আজ গভীর সংকটে ভুগছে।’
একইভাবে পিতার হাত ধরে চামড়া ব্যবসায় আসেন বোয়ালখালীর সামশুল আলম। ঢাকার ট্যানারিশিল্প মালিকদের কাছে তার বড় অঙ্কের বকেয়া আটকে রয়েছে। পুঁজি হারিয়ে ধার-দেনা ও ঋণের ভারে অনেকটা দেউলিয়া হয়ে যান। তারপরও জমি-জমা বিক্রি করে পৈত্রিক ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তার মতো অন্তত দুই শতাধিক ব্যবসায়ী বিপর্যস্ত-দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন।
চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা বলেন, স্বাধীনতার পরও চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি ছিল। একে একে সব ট্যানারি বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামে বর্তমানে টিকে রয়েছে একটিমাত্র ট্যানারি। এরপর চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা ঢাকানির্ভর হয়ে পড়ে। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া ও মর্জিমাফিক ব্যবসার কারণে কঠিন সংকটে পড়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।
গত শনিবার সাংবাদিক সম্মেলন করে চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প কঠিন সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে দাবি করেছেন আড়তদার সমিতির নেতারা। তারা দাবি করেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি হয়ে রয়েছেন এখানকার আড়তদাররা। কোরবানি ঈদে সরকারি দর না মেনে সিন্ডিকেট করে মর্জিমাফিক দরে চামড়া কিনে ট্যানারি মালিকেরা।
আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান পূর্বকোণকে বলেন, ২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় ২০ কোটি টাকার বকেয়া আটকে রয়েছে। সর্বস্বন্ত হয়ে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ট্যানারি ও আড়তদার-ব্যবসায়ী একে অপরের পরিপূরক। একপক্ষ ছাড়া অন্যপক্ষ অচল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা দরকার।
চট্টগ্রাম হচ্ছে চামড়া ব্যবসার অন্যতম বড় এলাকা। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় গরু-ছাগল মিলে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়। তবে ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে করোনার ধাক্কা লাগে। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দেয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাস্তা থেকে দেড় লক্ষাধিক চামড়া কুড়িয়ে নিয়ে ডাম্পিং করেছিল। পরের বছরও (২০২০ সাল) একই অবস্থা হয়েছিল। এরপর থেকে চামড়া ব্যবসা ধীরে ধীরে ধস নামতে থাকে।
এই খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চামড়াশিল্পের কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত ও উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারায় বিশ^বাজারে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। অথচ চামড়াশিল্প হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিযোগ্য খাত।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকার সাভারের চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) গুণগতমানের ত্রুটি, আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকা ও বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ চামড়াশিল্পে পিছিয়ে পড়েছে। কারণ কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত ও উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারায় ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত বিশে^র জুতা তৈরির বড় ব্র্যান্ড বা ক্রেতারা চামড়া কেনেন না।
চট্টগ্রামের বড় ও নামকরা ট্যানারি হচ্ছে মদীনা ট্যানারি। পরিবেশগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
মদীনা ট্যানারির মালিক মালিক হাজি আবু মোহাম্মদ ইতিমধ্যে বলেছিলেন, ‘আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, জাপান, কোরিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে আমরা চামড়া রপ্তানি করতাম। পরিবেশ দূষণের নামে সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে চামড়াশিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। গত সরকারের ব্যর্থতা নির্ণয় করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলে চামড়া খাত হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে।’
চট্টগ্রামে বর্তমানে টিকে রয়েছে রিফ লেদার ট্যানারি। টি কে গ্রুপের সহযোগী এ প্রতিষ্ঠানটি কালুরঘাটে শিল্পাঞ্চলে ১৯৯১ সালে স্থাপন করা হয়। এলডব্লিউজির সনদ পাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও জুতা রপ্তানি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
রিফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘এলডব্লিউজি সনদ ছাড়া ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলো চামড়া ও চামড়াপণ্য কিনে না। আমাদের এ সনদ থাকায় বিশ্বের ভালো ব্রান্ড কোম্পানির ক্রেতা রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক দামও পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদের কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী-আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে বন্ধ হওয়া ট্যানারি চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় চামড়াশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।’