রবিবার ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬

মধ‍্যপ্রাচ‍্যের যুদ্ধে উভয় পক্ষের লক্ষ‍্যবস্তু হয়ে উঠছে পানি

যুদ্ধ সংঘটিত হলে প্রতিপক্ষের অস্ত্রাগারসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। তবে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে নতুন করে উঠে আসে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা। আর চলমান ইরান যুদ্ধে হামলার নতুন লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পানি শোধনাগার। ইতিমধ্যে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি শোধনাগারে হামলার হুমকি দিয়েছে। তাদের দাবি, চলমান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে তাদের নিজস্ব পানি এবং জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

ইরান কী বলছে

গত রবিবার ইরানের সামরিক বাহিনী অঞ্চলটির অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দেন। ট্রাম্প বলেন, “আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাবে।”

ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, সতর্ক করার পরও যদি শত্রুপক্ষ যদি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায় তাহলে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত সব জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তা পুনরায় খোলা হবে না যতক্ষণ না ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়।

ইরানের হুমকির কারণে সবশেষ তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এ পথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর ফলে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে ভয়াবহতম জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।

আগে যেসব অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল?

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, গত ৮ মার্চ ইরানি একটি ড্রোন তাদের একটি পানি শোধনাগারে আঘাত হানে। এতে পানি অবকাঠামোটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাহরাইনের অভিযোগ, তেহরান ইচ্ছে করেই বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

অবশ্য, হামলার পর বাহরাইনের ন্যাশনাল কমিনিউকেশন দফতর থেকে বলা হয়, ইরানি হামলায় পানি সরবরাহ বা নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটিতে কোনও প্রভাব পড়েনি।

বাহরাইনে হামলার একদিন আগে অর্থাৎ, ৭ মার্চ কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি পানি শোধনাগারে হামলা হয়। ওই শোধনাগার থেকে ইরানের ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করা হত। হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে ইরান।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, বাহরাইনের একটি ঘাঁটি থেকে কেশম দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের জ্বালানি মন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি রবিবার বলেন, “হামলাগুলো ডজনখানেক পানি পরিবহন ও পরিশোধন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের কিছু অংশ ধ্বংস করেছে।”

যুদ্ধরত পক্ষগুলো যদি পানি সরবরাহকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে এটি আজকের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ একটি যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে, গত মার্চের শুরুর দিকে এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন পানি অর্থনীতিবিদ এসথার ক্রাউজার-ডেলবুর্গ।

পানি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উপসাগরীয় দেশগুলোতে সুপেয় পানির চরম অভাব। আরব দেশগুলোর পানীয় জলের বেশিরভাগই সমুদ্র থেকে সংগৃীহত। পানি পরিশোধন করে মানুষদের দেয় দেশগুলোর সরকারেরা।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে পানির প্রাপ্যতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। এ কারণে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পানীয় জলের সরবরাহের জন্য লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণার মতে, বিশ্বের মোট লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধিকরণ সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত।

ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন’র ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে সুপেয় পানির ৪২ শতাংশ লবণাক্ত পানি থেকে আসে। অর্থাৎ, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে মানুষকে দেওয়া হয়। সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ এবং কুয়েতে ৯০ শতাংশ পানি বিশুদ্ধিকরণ প্ল্যান্ট থেকে আসে।

ক্রাউজার-ডেলবুর্গ বলেন, “অঞ্চলটিতে লবণাক্ত পানি ছাড়া কিছুই নেই।”

দুবাই ও রিয়াদের মতো বড় শহরগুলোর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ বিশেষভাবে কৌশলগত। ২০১০ সালেই সিআইএ সতর্ক করে জানিয়েছিল, অধিকাংশ আরব দেশে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধিকরণ স্থাপনাগুলো ব্যাহত হলে অন্য যেকোনো শিল্প বা পণ্যের ক্ষতির তুলনায় আরও গুরুতর পরিণতি হতে পারে।

উইকিলিকসে প্রকাশিত ২০০৮ সালের এক মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছিল, যদি জুবাইলের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট বা এর পাইপলাইনগুলো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে রিয়াদকে এক সপ্তাহের মধ্যে খালি করতে হতে পারে।

পানি শোধনাগারগুলো কেমন হুমকিতে রয়েছে

শুধু কি সরাসরি হামলার মুখে রয়েছে প্ল্যান্টগুলো। এমন প্রশ্ন আসলে উত্তর হবে ‘না’। কারণ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া সমুদ্রের পানি দূষণে প্ল্যান্টগুলো ঝুঁকির মুখে থাকে। বিশেষজ্ঞরা এমন মন্তব্যই করছেন।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান ভিয়োলিয়ার আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের পরিচালক ফিলিপ বুরদো বলেছেন, “আমরা প্ল্যান্টগুলোর আশপাশের এলাকায় প্রবেশ-নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছি।” এই প্রতিষ্ঠানটি সৌদি আরবের জুবাইল এবং ওমানের মাসকট, সুর ও সালালাহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে সরবরাহ করে।

বুরদো বলেছেন, “সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অবশ্যই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। কিছু দেশে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ বৃহত্তম প্ল্যান্টগুলোর চারপাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।”

অপারেটরদের কাছেও তেল ছড়িয়ে পড়ার ক্ষতি সীমিত করার জন্য বিভিন্ন উপায় রয়েছে।

পানি শোধনাগারে হামলার নজির

গত দশকে লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর ওপর কয়েকটি হামলা হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের একটি প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছিল। পানি সংক্রান্ত সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী প্যাসিফিক ইনস্টিটিউট’র তথ্য মতে, ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা অতীতে সৌদি আরবের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। আর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাল্টা হিসেবে ইয়েমেনের পানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছে।

ইনস্টিটিউটটি বলছে, গাজা উপত্যকায় পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। এছাড়া ১৯৯১ সালে গালফ যুদ্ধেও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোতে হামলা চালানো হয়।

হামলা বাড়লে কী হবে?

এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদী বিঘ্ন থেকে শুরু করে অনেক বেশি গুরুতর পরিণতি পর্যন্ত হতে পারে। ক্রাউজার-ডেলবুর্গ বলেন, “প্ল্যান্টে হামলা হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বড় শহরগুলোতে। পানির ঘাটতি অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পর্যটন, শিল্প এবং ডেটা সেন্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যেগুলো শীতলীকরণের জন্য বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়।”

বুরদো বলেন, “কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রয়েছে। লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে একটি স্থাপনা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব কিছুটা সীমিত করা যায়। বেশিরভাগ প্ল্যান্টে দুই থেকে সাত দিনের পানি ব্যবহারের সমপরিমাণ মজুত থাকে যা সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী না হলে ঘাটতি প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট।”

Translate