বুধবার ২২শে এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাজ্যে উচ্ছেদ আতঙ্কে বাংলাদেশি পরিবারের মানবাধিকার রক্ষার লড়াই

যুক্তরাজ্যের বার্কশায়ারের রিডিং শহরের একটি রিটায়ারমেন্ট হোমে সপরিবারে বসবাস নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েছেন ৫৯ বছর বয়সী প্রবাসী বাংলাদেশি শহিদুল হক। ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য নির্ধারিত আবাসন ডেভিড স্মিথ কোর্টে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে বসবাস করায় তাকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে নিজের পারিবারিক জীবনের অধিকার (ইসিএইচআর অনুচ্ছেদ ৮) রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ৯ সন্তানের জনক এই বাংলাদেশি।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বার্কশায়ার কাউন্সিলের মাধ্যমে গৃহহীন হিসেবে ডেভিড স্মিথ কোর্টে একটি একক কক্ষের ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান শহিদুল হক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় ভুগছেন, যার কারণে তিনি সরকারি ভাতাও পেয়ে থাকেন।

রিটায়ারমেন্ট হোমটি মূলত বয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত হলেও, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর শহিদুল হকের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা মন্নি (২৮) এবং তাদের তিন বছর বয়সী যমজ দুই কন্যা যুক্তরাজ্যে পৌঁছালে তিনি তাদের নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন। এরপরই আবাসন কর্তৃপক্ষ সাউদার্ন হাউজিং তার বিরুদ্ধে লিজের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ এনে উচ্ছেদের নোটিশ দেয়।

শহিদুল হকের আইনজীবীদের দাবি, ১৯৯৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও শহিদুল হক ইংরেজি ভাষায় ততটা দক্ষ নন। ফ্ল্যাট বরাদ্দের সময় চুক্তিনামার শর্তাবলি তার মাতৃভাষা সিলেটিতে বুঝিয়ে বলা হয়নি। ফলে তিনি বুঝতে পারেননি যে তার নিজের ফ্ল্যাটে স্ত্রী-সন্তানদের রাখা আইনত নিষিদ্ধ।

শহিদুলের আইনজীবী ইসাবেল বার্টশিঙ্গার আদালতে যুক্তি দিয়েছেন যে, তার স্ত্রী স্পাউস ভিসায় এবং দুই সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে বৈধভাবেই দেশটিতে আছেন। এই অবস্থায় তাদের ঘর থেকে বের করে দিলে বা পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করলে তা ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের ‘আর্টিকেল ৮’-এর চরম লঙ্ঘন হবে।

এদিকে, শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত এই রিটায়ারমেন্ট হোমে শিশুদের উপস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন অন্য বয়স্ক বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শিশুদের উচ্চশব্দ এবং দেয়ালে আঁকাআঁকি করা ছাড়াও তারা বারবার জরুরি সেবা ডাকার কর্ড টেনে দিচ্ছে। গত ২০ ডিসেম্বর এক দিনেই ৯ বার এবং পরবর্তীতে এক দিনে ৪ বার এই কর্ড টেনে সাহায্য চেয়ে কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উঠেছে শিশুদের বিরুদ্ধে।

সাউদার্ন হাউজিংয়ের প্রতিনিধি জারেড নরম্যান আদালতে জানিয়েছেন, আবাসনটি বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অক্ষমদের জন্য তৈরি। এখানে ছোট শিশুদের নিয়ে বসবাস করা অন্য বাসিন্দাদের জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত আগস্টে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট বিচারক সাইমন লিন্ডসে তাৎক্ষণিক উচ্ছেদের নির্দেশ দেননি। মানবিক দিক বিবেচনা করে মামলাটি কয়েক দফা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৫ মে এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত শহিদুল হক তার পরিবার নিয়ে এই ফ্ল্যাটেই থাকতে পারছেন।

যুক্তরাজ্যের আবাসন সংকট এবং মানবাধিকার আইনের এই লড়াই এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শহিদুল হক বলেন, আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমাদের অপরাধ কী? আমি শুধু আমার স্ত্রী-সন্তানদের সাথে মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।

Translate