সোমবার ৪ঠা মে, ২০২৬

৬ শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন ৬ জন!

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে মনোরম পরিবেশে দৃষ্টিনন্দন চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে পাঠদানে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরত শিক্ষকরা।

১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শতবর্ষ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিষদ। ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। এক সময় দক্ষিণ অঞ্চলের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সচেতন অভিভাবকদের আস্থার জায়গা হারাচ্ছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক কর্মচারী মিলে ২৮টি পদ রয়েছে। তৎমধ্যে ২১ জন শিক্ষকের স্থলে বর্তমানে মাত্র ৬ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। তৎমধ্যে চলতি বছর আগস্ট মাসে পিআরএল-এ যাচ্ছেন সিনিয়র শিক্ষক শাহজাহান আজাদ। তখন মাত্র ৫ জন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো কঠিন হবে প্রতিষ্ঠানের। অথচ এ প্রতিষ্ঠানে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে আরো ৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন।

জানা যায়, ৪র্থ শ্রেণির ৬ জনের স্থলে ১জন, ৩য় শ্রেণির ২টি পদই খালি। পাশাপাশি লাইব্রেরিয়ান ও কম্পিউটার শিক্ষকের পদ দুটিও খালি রয়েছে। অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত পাঠদান প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ বা বদলি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শূন্যতা পূরণ না করা হলে এলাকার মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, সরকারিকরণের ৮ বছরের মধ্যেই ভয়াবহ শিক্ষক সংকটে পড়েছে বিদ্যালয়টি। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হওয়ার সময় ১৬ জন শিক্ষক থাকলেও পর্যায়ক্রমে ১০ জন শিক্ষক অবসরজনিত কারণে বিদ্যালয় থেকে চলে যান। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে ১ জন শিক্ষকও বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে যোগদান করেননি। ফলে দিন দিন শিক্ষক সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। যেখানে একসময় ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষক পাঠদান করতেন, বর্তমানে এক শিফটে সাধারণ শাখায় স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৬ জন। ইংরেজি, বাংলা, বিষয় ভিত্তিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক শূন্যতা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারিকরণের পূর্বে বিদ্যালয়টিতে ১৬ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকলেও অবসরের পর শূন্য পদে নতুন নিয়োগ হয়নি কোনো শিক্ষক। ফলে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬ শতাধিক। সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৬ জন। জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী গড়ে ৪০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার কথা।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এম.এ মতিন বলেন, সরকারি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি, বাংলা, বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞান, ধর্মীয় শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। ৭ জন কর্মচারীর অনুমোদিত পদের বিপরীতে রয়েছে মাত্র একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষক স্বল্পতার মধ্যেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার এ বিষয়ে অবহিত করেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাওয়া যায়নি। এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার বিপিন চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মো. রাজিব হোসেন বলেছেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকেও জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।

উল্লেখ্য, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ৮ জন খÐকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে চলছে পাঠদান। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে ৫ জন কর্মচারী দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সব শূন্য পদ পূরণ করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবকমহল।

Translate