মঙ্গলবার ১৯শে মে, ২০২৬

১৪২ কোটি জনগণের ভারতে উলটো সুর, বেশি সন্তান নিতে প্রণোদনার ঘোষণা

১৪২ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। উচ্চ যুব বেকারত্বসহ নানা আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী রাজনৈতিক মিত্ররা এখন জনসংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জন্মহারের আশঙ্কাজনক পতন ঠেকাতে তারা নাগরিকদের বড় পরিবার গঠনে বা বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছেন।

যদিও জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যা আগামী আরও চার দশক ধরে বাড়তে থাকবে এবং তা সর্বোচ্চ ১৭০ কোটিতে পৌঁছাবে; তবুও দেশটির কিছু নীতি-নির্ধারক এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর দাবি—ছোট পরিবার গঠনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। আর এ জন্য প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া উচিত।

সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯২-৯৩ সালে ভারতে নারীপ্রতি গড় সন্তান জন্মদানের হার ছিল ৩ দশমিক ৪। কিন্তু গর্ভনিরোধকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং নারীদের শিক্ষার হার বাড়ায় ২০১৯-২১ সাল নাগাদ তা কমে ২-এ নেমে এসেছে। সরকারি হিসাব মতে, জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে বা প্রতিস্থাপনের জন্য এই হার অন্তত ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ—যেখানে মোদির দল ও একটি আঞ্চলিক দলের জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে—গত সপ্তাহান্তে এক অভিনব ঘোষণা দিয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় সন্তানের জন্য পরিবারগুলোকে এককালীন ৩০ হাজার রুপি (প্রায় ৩১১.৫৭ ডলার) এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর আগে দ্বিতীয় সন্তানের জন্য ২৫ হাজার রুপি দেওয়ার একটি প্রস্তাব থাকলেও প্রথম সন্তানের জন্য কোনো সরাসরি সহায়তার কথা বলা হয়নি। তবে নতুন এই পরিকল্পনাটি কবে থেকে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, অতীতে আমরা পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেছি। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা চাই এখন থেকে সন্তানকে যেন ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়।

এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট রাজ্য সিকিমও পরিবারগুলোকে বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এ জন্য তারা এক বছরের মাতৃত্বকালীন ছুটি, এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং আইভিএফ (ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনা দিচ্ছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক তাদের জন্মহার খুব বেশি মনে করে তা কমানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১৫ সালের মধ্যে তারা সবাই নীতি পরিবর্তন করে জন্মহার বাড়ানোর প্রচারণা শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল যে আদর্শিক সংগঠন থেকে উঠে এসেছে, সেই প্রভাবশালী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-ও বড় পরিবার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে এবং একে একটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে বলেন, আমরা বলি ভারত তরুণদের দেশ… কিন্তু ধীরে ধীরে জন্মহার কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করবে।

উল্লেখ্য, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে ভারতের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে এ হার ছিল অনেক বেশি—প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। যার মধ্যে শহরাঞ্চলে যুব বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

সূত্র: সামা টিভি

Translate