ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ইউরোপীয় নেতারা মহাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তাদের মতে, ইউরোপের জন্য রাশিয়ার হুমকি রয়ে গেছে। এমন সময়ে অনেক দেশই নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীতে প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও রাশিয়া ইউরোপে হামলার কোনও পরিকল্পনা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কীভাবে তাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়াতে চাইছে, সেটির চিত্র তুলে ধরেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
জার্মানি
জার্মান সরকার গত নভেম্বরে নতুন একটি সামরিক সেবা কাঠামোতে সম্মত হয়েছে। এতে বেশি বেতন ও উন্নত প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকছে। সামরিক সেবা স্বেচ্ছাসেবীই থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় নতুন সদস্য না মিললে বাধ্যতামূলক ডাকার সুযোগ রাখা হয়েছে। জার্মানি বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার সেনা থেকে সংখ্যা বাড়িয়ে ২ লাখ ৬০ হাজারে নিতে চায়। একই সঙ্গে রিজার্ভ সদস্যসংখ্যা দ্বিগুণ করে ২ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে আইন কার্যকর হওয়ার কথা। বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু হবে। তবে বাধ্যতামূলক ডাক কার্যকর করতে হলে সংসদের আলাদা ভোট লাগবে। নারীদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
ফ্রান্স
ফ্রান্স ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নতুন একটি স্বেচ্ছাসেবী যুব সামরিক সেবা চালু করতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘোষণা অনুযায়ী, ১০ মাসের এই কর্মসূচি ১৮ ও ১৯ বছর বয়সীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং অংশগ্রহণকারীরা বেতন পাবেন। ২০২৬ সালে এতে ৩ হাজার তরুণকে যুক্ত করার লক্ষ্য, যা ২০৩০ সালে ১০ হাজারে উন্নীত হবে। ম্যাক্রোঁর লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫০ হাজার তরুণকে যুক্ত করা। একই সময়ে ফ্রান্স ২০৩০ সালের মধ্যে রিজার্ভ সদস্যসংখ্যা ১ লাখে নিতে চায়, যা বর্তমানে প্রায় ৪৭ হাজার। এতে মোট সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার।
ব্রিটেন
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সংসদ মেয়াদে, সম্ভবত ২০২৯ সাল থেকে সামরিক অর্থায়ন বাড়লে পূর্ণকালীন সেনা সংখ্যা অন্তত ৭৬ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীতে প্রায় ৭৪ হাজার সদস্য ও ২৫ হাজার রিজার্ভ সদস্য রয়েছেন। মোট সশস্ত্র বাহিনীর জনবল প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার। আপাতত ব্রিটেন সদস্য ধরে রাখা ও আধুনিকীকরণে মনোযোগ দিচ্ছে। বাধ্যতামূলক সেনাসেবার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ডেনমার্ক
ডেনমার্ক ২০২৬ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক সেনাসেবার মেয়াদ চার মাস থেকে ১১ মাসে উন্নীত করতে চায়। একই সঙ্গে ২০৩৩ সালের মধ্যে নতুন রিক্রুট সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০-এ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে নারীদেরও বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে।
ফিনল্যান্ড
ফিনল্যান্ডে পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা রয়েছে। এতে যুদ্ধকালীন বাহিনীর শক্তি ২ লাখ ৮০ হাজারে রাখা হয় এবং প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার নতুন সেনা রিজার্ভে যুক্ত হয়। তবে জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রিজার্ভ সংখ্যা সীমিত হতে পারে। ফিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল জান্নে জাক্কোলা বলেছেন, নারীদের জন্যও বাধ্যতামূলক সেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বর্তমানে তারা স্বেচ্ছায় সেবা দিতে পারেন। সরকার পুরুষদের জন্য সেবার বয়সসীমা ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করতে চায়। এতে ২০৩১ সালের মধ্যে রিজার্ভ বাহিনী ৮ লাখ ৭০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ১০ লাখে পৌঁছাবে।
ইতালি
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তো বলেছেন, হাইব্রিড যুদ্ধ মোকাবিলায় দেশটির জরুরি ভিত্তিতে ৫ হাজার সদস্যের একটি নতুন বেসামরিক ও সামরিক ইউনিট প্রয়োজন। এটি সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে। শুরুতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ জন নিয়োগ দিয়ে ধীরে ধীরে ৫ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে ৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে।
নেদারল্যান্ডস
নেদারল্যান্ডস সেনাসদস্য সংখ্যা ৭৪ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লাখে নিতে চায়। বিশেষ করে রিজার্ভ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পোল্যান্ড
ন্যাটোর অন্যতম বড় সামরিক শক্তি পোল্যান্ড ২০২৬ সালে প্রায় ৪ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে। এটি স্বেচ্ছাসেবী এবং সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে মৌলিক নিরাপত্তা, টিকে থাকার কৌশল, চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
রোমানিয়া
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর রোমানিয়া স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ বাড়িয়েছে। বেশি বেতন ও সামরিক শিক্ষার প্রচার চালানো হচ্ছে। মোট সদস্যসংখ্যা স্থিতিশীল থাকলেও দক্ষ জনবল, বিশেষ করে যুদ্ধবিমানচালক ও আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত সদস্য ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ছে দেশটি। সম্প্রতি সংসদ ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সামরিক সেবা আইন পাস করেছে। এতে চার মাসের বেতনভুক্ত প্রশিক্ষণ ও শেষে তিন মাসের সমপরিমাণ বোনাস থাকবে।
সুইডেন
সুইডেন ২০১৭ সালে আবার বাধ্যতামূলক সেনাসেবা চালু করে। চলতি বছর ৭ হাজারের বেশি সেনা নিয়োগ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার স্বেচ্ছাসেবক যোগ দিয়েছেন। ২০৩২ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১২ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সেনাবাহিনী সম্প্রসারণে সেনা নিয়োগ বড় ভূমিকা রাখলেও পেশাদার কর্মকর্তার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের শেষে সুইডেনের সশস্ত্র বাহিনীতে ৯ হাজার ৭০০ পেশাদার কর্মকর্তা ছিলেন। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা অন্তত ১১ হাজার ৮০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক কর্মীর সংখ্যাও আগামী বছরগুলোতে প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।