সোমবার ২০শে এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে আমিরাত কেন ইরানের নিশানায়?

সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান বর্তমানে এই উপসাগরীয় দেশটির ওপর তাদের হামলা ও হুমকির তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে। ভৌগলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততার কারণে আমিরাত এখন ইরানের কাছে একটি ‘আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু’। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

যুদ্ধের আগে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক শীতল থাকলেও দূতাবাস চালু ছিল। এমনকি যুদ্ধ শুরুর চার দিন আগেও দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছিল। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার ইরানি আমিরাতে বসবাস করছেন। দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা (গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব এবং আবু মুসা) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

সোমবার আবু ধাবি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, শাহ তেল ক্ষেত্রে ড্রোন হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই দিনে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি জ্বালানি ট্যাংকে ড্রোন আঘাত হানে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি হামলা হয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।

আমিরাতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ইরান থেকে ছোঁড়া ১ হাজার ৬২৭টি ড্রোন, ৩০৪টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ১৫টি ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলা করেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত আমিরাতের ২ জন সামরিক সদস্য এবং ৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। শুধু সোমবারই দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৬টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ২১টি ড্রোন মোকাবিলা করেছে।

আমিরাতের জুমেইরাহ বুর্জ আল আরব হোটেল, রুয়াইস শোধনাগার এবং দুবাইয়ে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটেও হামলার প্রভাব পড়েছে।

আমিরাত কেন লক্ষ্যবস্তু?

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমিরাত ইরানের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত। সংকীর্ণ জলসীমার কারণে স্বল্পপাল্লার ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে এখানে আঘাত করা সহজ। তবে ভৌগলিক কারণ ছাড়াও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ট্রেন্ডস ইউএস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিলাল সাব বলেন, ইরান মনে করে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের ওপর অন্য যেকোনও উপসাগরীয় দেশের তুলনায় আবুধাবির প্রভাব বেশি। আমিরাতে হামলা চালিয়ে ইরান মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সামরিক অভিযান বন্ধে চাপ প্রয়োগ করতে চায়।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গেও তাদের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট-এর সিনিয়র স্কলার ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, আমিরাত এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিশ্বায়ন-সংযুক্ত দেশ। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন এবং এনভিডিয়ার মতো বড় কোম্পানির অফিস এখানে। তাই বৈশ্বিক প্রভাব তৈরি করতে ইরান আমিরাতকে বেছে নিয়েছে।

ইরানের অভিযোগ ও আমিরাতের অবস্থান

ইরান এই হামলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, গত শনিবার হরমুজ প্রণালির খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাটি ‘দুবাইয়ের খুব কাছ থেকে’ পরিচালিত হয়েছিল। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা আমিরাতে অবস্থিত একটি মার্কিন গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

তবে আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, “আরাঘচির মন্তব্য একটি বিভ্রান্তিকর নীতির বহিঃপ্রকাশ। আমিরাতের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে, তবে আমরা এখনও সংযম প্রদর্শন করছি এবং কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছি।”

সংকটে আমিরাতের বিকল্প

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমিরাতের সামনে বর্তমানে খুব সীমিত পথ খোলা আছে। বিলাল সাবের মতে, এই মুহূর্তে আমিরাতের একমাত্র বিকল্প হলো রক্ষণাত্মক থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্পষ্ট অবস্থান ছাড়া ইরানের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালানো আমিরাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

অন্যদিকে, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমিরাতের চামড়া অনেক পুরু এবং মাংস তেতো; আমরা সহজ শিকার নই।

Translate