বুধবার ২২শে এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাজ্যের মসজিদ: নামাজের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনরক্ষার আশ্রয়

যুক্তরাজ্যের মসজিদগুলোর চিরচেনা রূপ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাত শেষ হলেই যেখানে তালা পড়ত২০২৬ সালে এসে সেসব মসজিদ পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ মুসলিমদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক অবিচ্ছেদ্য ভরসায়। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের ২ হাজার ১৬৪টি মসজিদের প্রায় সবকটিতেই নামাজ শেষে দরজা বন্ধ রাখার সংস্কৃতি ছিলচুরি ও উগ্রবাদী হামলার আশঙ্কা থেকেই এই অভ্যাস গড়ে ওঠে।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের দূরদর্শী মুসলিম নেতৃত্ব সেই চিত্র পাল্টে দিচ্ছে দ্রুতগতিতে। ব্র্যাডফোর্ডের জামিয়া ওসমানিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মসজিদের পবিত্র পরিসরে শারীরিক ফিটনেস ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্ত করে দেখাচ্ছেমসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও সামাজিক মেলবন্ধনেরও আশ্রয়।

যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ৪৪ লাখের বেশি মুসলিম বাস করেনযা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ইংল্যান্ডওয়েলস ও স্কটল্যান্ড মিলিয়ে মসজিদ রয়েছে ১ হাজার ৮৯৩টি। গড়ে প্রতিটি মসজিদের ওপর প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের দায়িত্ব পড়ে। ব্রিটিশ মুসলিমদের বড় অংশই দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূতএই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা ও একাকীত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ীএশীয় পুরুষদের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রম করেন না। এই স্বাস্থ্যঘাটতি পূরণে মসজিদগুলো কার্যকর ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। পরিচিত ধর্মীয় পরিবেশেই আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় মুসল্লিদের অংশগ্রহণও বাড়ছে।

এই রূপান্তরের পেছনে ব্রিটিশবাংলাদেশি কমিউনিটির অবদান উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম এই সামাজিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মসজিদগুলোতে কর্মরত কয়েক হাজার বাংলাদেশি ও ব্রিটিশবংশোদ্ভূত ইমাম এখন খুতবায় শুধু ধর্মতত্ত্ব নয়সামাজিক সংহতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বও তুলে ধরছেন।

টাওয়ার হ্যামলেটস থেকে ব্র্যাডফোর্ডবাংলাদেশি পরিচালিত অনেক মসজিদই স্থানীয় কাউন্সিলের বিকল্প হয়ে উঠছে। সরকারি সেবার পরিসর সংকুচিত হওয়ার সময়ে ইমাম ও মসজিদ কমিটিগুলোই সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই ব্রিটিশ মডেলটি বাংলাদেশের পাঁচ লাখের বেশি মসজিদের জন্য একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন চাইলে বড় বাজেট ছাড়াই স্থানীয় মসজিদগুলোকে কমিউনিটি হাবে রূপ দিতে পারে। নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে বয়স্কদের জন্য হালকা ব্যায়ামের ব্যবস্থাইমাম প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষনের মতো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।

বড় বিনিয়োগ ছাড়াই সদিচ্ছা থাকলে প্রতিটি গ্রামের মসজিদ ধাপে ধাপে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং বা প্রাথমিক পরামর্শকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের চাপও কমবে।

যুক্তরাজ্যের অনেক মসজিদই আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন থেকে রূপান্তরিত করা হয়েছেকারণ জায়গার অভাব প্রকট। এই সীমাবদ্ধতায় তারা ব্যবহার করছে বিশেষ ‘ওয়েলনেস টুলকিট’। নামাজের দীর্ঘ বিরতিতে মূল হলরুমে পাইলেটস বা ইয়োগার মতো হালকা ব্যায়ামকরিডোর বা বেজমেন্টে চেয়ার এক্সারসাইজ ও মানসিক স্বাস্থ্য আলোচনা সবই চলছে সীমিত পরিসরে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক ‘শান্তি রক্ষী’ নিয়োগ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছেযাতে নারী ও তরুণরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারেন। এই পদ্ধতি বাংলাদেশের জনবহুল এলাকার মসজিদগুলোর জন্যও কার্যকর হতে পারে।

লন্ডনের সাউথ উডফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের ইমাম মাওলানা নাজমুল হক বলেনমসজিদকে কেন্দ্র করে এই স্বাস্থ্য উদ্যোগ কোনও আধুনিক উদ্ভাবন নয়এটি সুন্নাহরই প্রতিফলন। বুখারি শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ সহীহ মুসলিমে এসেছে, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’

এই কুরআনসুন্নাহর শিক্ষাই প্রমাণ করেশারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মুসলমানের জন্য ইবাদতের অংশ। যখন মসজিদ মুসল্লিদের একাকীত্ব কমায় বা অসুস্থতা লাঘবে সহায়তা করেতখন সেটি মূলত মদিনার মসজিদের সেই মহান আদর্শকেই নতুন করে জীবন্ত করে তোলে।

Translate