সোমবার ২০শে এপ্রিল, ২০২৬

ব্রিকসের সংহতির বুলি কি কেবল কাগজের ফুল হয়ে থাকবে?

পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলো। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলোর জোট ব্রিকস থেকে আসেনি কোনও যৌথ বিবৃতি। যারা এক সময় কল্পনা করেছিলেন যে ব্রিকস হবে মার্কিন আধিপত্যের বিকল্প এক শক্তিশালী মেরু, যুদ্ধের বাস্তবতায় তাদের সেই স্বপ্ন এখন বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের গঠনতন্ত্র আর সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রেষারেষির দিকে তাকালে এই ব্যর্থতা মোটেও বিস্ময়কর নয়।

ব্রিকস যখন মস্কোর ভাষায় ‘সম্মিলিত পশ্চিমের’ বিরুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘ লড়াইয়ে বিশেষ কিছু করতে পারেনি, তখনই এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছিল। এখন সমস্যা আরও প্রকট। জোটের অন্যতম সদস্য ইরানের ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করল, তখন ব্রিকস একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া জানাতেও হিমশিম খাচ্ছে।

এর কারণ স্পষ্ট, জোটের অনেক সদস্য দেশই এখন ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। যেমন বর্তমান সভাপতি ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার কাঠামোগত বৈরিতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, আর আমিরাত দীর্ঘকাল ধরে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদার।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিকসের এই স্থবিরতা আসলে একটি পুরনো ধারারই প্রতিফলন। গত শতাব্দীতে প্যান-এশিয়ানিজম, প্যান-ইসলামিজম, প্যান-অ্যারাবিজম কিংবা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মতো বড় বড় আদর্শিক ঐক্যগুলো একই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। যখনই জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংহতির সংঘাত হয়েছে, জয় হয়েছে জাতীয় স্বার্থেরই।

বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের ডাক দিয়ে মিনটার্ন (১৯১৯) গঠিত হলেও ১৯৩৯ সালে স্ট্যালিন যখন নাৎসি জার্মানির সঙ্গে চুক্তি করেন, তখন রাতারাতি ফ্যাসিবাদকে ‘শত্রু’র বদলে ‘নিরপেক্ষ’ শক্তি হিসেবে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৪৩ সালে স্ট্যালিন নিজেই এটি বিলুপ্ত করেন।

১৯৫৮ সালে মিসর ও সিরিয়া মিলে একটি একক রাষ্ট্র প্যান-অ্যারাবিজম গঠনের চেষ্টা করলেও মাত্র তিন বছরের মাথায় সিরিয়ার আপত্তির মুখে তা ভেঙে যায়। ফিলিস্তিন ইস্যুতেও আরব বিশ্ব কখনোই ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ১৯৯০ সালে যখন ইরাক কুয়েত আক্রমণ করে, তখন এক আরব রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করার মাধ্যমে এই ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সফল আসিয়ান জোটটিও দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের চাপের মুখে ফিলিপাইনকে সমর্থন দিতে পারছে না। কারণ কম্বোডিয়া ও লাওসের মতো সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে চীনের রয়েছে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক।

ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি ভারত এই সংকটের সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। তবে তা কোনও সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নয়, বরং হরমুজ প্রণালিতে ভারতের নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক ব্যবস্থা এখনও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর ওপর ভিত্তি করেই টিকে আছে। প্রতিটি সরকার তার দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কাছে দায়বদ্ধ। সেখানে ‘সবার জন্য এক, আর একের জন্য সবাই’, এই তত্ত্বে নিজের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া কঠিন।

আরব লিগ, আসিয়ান কিংবা ওআইসির মতো ব্রিকসও এখন কেবল একটি আলোচনা সভায় পরিণত হয়েছে। বড় কোনও সংঘাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে তারা এখন ওয়াশিংটনের বোমাবর্ষণ আর তেহরানের পাল্টা হামলার নিছক দর্শক মাত্র। ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, যখন সংহতি আর জাতীয় স্বার্থ মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন সংহতির বুলি কাগজের ফুল হয়েই থেকে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর অবলম্বনে।

Translate