শনিবার ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬

বজ্রাঘাতে ১২ জনের মৃত্যু, নয় জনই কৃষক

কালবৈশাখী ঝড়ের মধ্যে ছয় জেলায় বজ্রাঘাতে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় পাঁচ জন, রংপুরে দুজন, ময়মনসিংহে দুজন এবং নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে একজন করে মারা গেছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে সুনামগঞ্জে, যেখানে হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে পাঁচ জন নিহত হন। পাশাপাশি নিহত ১২ জনের মধ্যে নয় জনই কৃষক, দুজন জেলে এবং একজন শিক্ষার্থী।

সুনামগঞ্জে পাঁচ জনের মৃত্যু

সুনামগঞ্জের চার উপজেলায় পৃথক বজ্রাঘাতে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চার জন কৃষক ও একজন শিক্ষার্থী। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও দিরাই উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- ধর্মপাশার হাবিবুর রহমান (৩০), রহমত উল্লাহ (১৫), জামালগঞ্জের নাজমুল হোসেন (১৯), তাহিরপুরের আবুল কালাম (২৫) ও দিরাইয়ের লিটন মিয়া (৩০)। রহমত উল্লাহ উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে এবং বাদশাগঞ্জ কলেজের ডিগ্রির শিক্ষার্থী।

দুপুরে ধর্মপাশার টগার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে হাবিবুর রহমান আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি উপজেলার পাইকরহাটি ইউনিয়নের বড়ই হাটি গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে। একই সময়ে জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামে বাড়ির পাশে ধান শুকাতে গিয়ে বজ্রাঘাতে রহমত উল্লাহর মৃত্যু হয়।

ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদ উল্ল্যা বলেন, ‘বজ্রাঘাতে উপজেলায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

দুপুরে তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে কৃষক আবুল কালাম আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাহিরপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‌‘বজ্রাঘাতে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে নাজমুল হোসেনের মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার চানপুর গ্রামের আমির আলীর ছেলে। জামালগঞ্জ থানার ওসি বন্দে আলী বলেন, ‘পাগনার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়াও আরও একজন আহত হন।’

দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে ধান কাটতে গিয়ে কৃষক লিটন মিয়ার মৃত্যু হয়। তিনি উপজেলার হাসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। দিরাই থানার ওসি এনামুল হক বলেন, ‘উপজেলায় বজ্রাঘাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।’

রংপুরে দুজনের মৃত্যু

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় বজ্রাঘাতে দুই জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও সাত জন আহত হয়েছেন। দুপুর ১টার দিকে উপজেলার ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের ছোট হযরতপুর মাঝিপাড়া গ্রামের অলিন রায়ের ছেলে মিলন রায় এবং রামেশ্বরপাড়া গ্রামের আনছের আলীর ছেলে আবু তালেব।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত ও আহতরা ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। এ সময় সেখানে পরপর কয়েকটি বজ্রাঘাত হলে ঘটনাস্থলে নয় জন আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মিলন রায় ও আবু তালেব মারা যান। আহতদের মধ্যে রয়েছেন গোল্ডেন মিয়া, তার স্ত্রী লিমা বেগম, মর্জিনা বেগম, জগদীশ রায়, সুবল, নিখিল ও শামছুল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং গুরুতরদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গোল্ডেন মিয়া ও লিমা বেগম বিলের ধারে মাছ ধরা দেখছিলেন। অন্য আহতরা মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান বলেন, ‘আহতদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

ময়মনসিংহে প্রাণ গেলো দুই কৃষকের

ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও গফরগাঁওয়ে বজ্রাঘাতে কৃষকসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বিকাল ৩টার দিকে গৌরীপুর উপজেলার বায়রাউড়া ও গফরগাঁও উপজেলার ধাইরগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- গৌরীপুর উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জ্বল (৩০) এবং গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানাধীন উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের মৃত সেকান্দর আলী খানের ছেলে মমতাজ আলী খান (৫৮)। রহমত আলী উজ্জ্বল কৃষিকাজ করতেন।

গৌরীপুর থানার ওসি মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘ধান কাটতে পাশের বায়রাউড়া গ্রামে যান রহমত আলী। এ সময় বজ্রাঘাতে গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করলে কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে।’

গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, মমতাজ আলী জোহরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে হঠাৎ বজ্রাঘাতে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খবর পাওয়ার পর পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা প্রক্রিয়াধীন। চলমান মৌসুমে বজ্রাঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকসহ সবাইকে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও জানান ওসি।

নেত্রকোনায় একজনের মৃত্যু

নেত্রকোনার আটপাড়ায় ধলার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে আলতু মিয়া (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহনূর রহমান।

এর আগে সকালে উপজেলার সুখারি ইউনিয়নে ধলার হাওড়ে কাজ করতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয় কৃষক আলতু মিয়ার। তিনি সুখারি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাতিয়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকালে ধলার হাওরে চলতি বোরো মৌসুমের ধান কাটতে যায় আলতু মিয়াসহ স্থানীয় কৃষকরা। এ সময় বৃষ্টি ও বজ্রাঘাত শুরু হলে কৃষকরা যে যার মতো বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন। বৃষ্টির থামলে কৃষকরা আবার ধান কাটতে গেলে হাওরের জমিতে আলতু মিয়ার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঝলসানো চিহ্ন দেখে স্থানীয়রা নিশ্চিত হন বজ্রাঘাতে আলতু মিয়ার মৃত্যু হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে লাশ বাড়ি নিয়ে যান।

ইউএনও মো. শাহ্‌নূর রহমান বলেন, ‘হাওরে কাজ করতে গিয়ে একজন কৃষক নিহত হয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নিয়েছি। ওই কৃষকের দাফন-কাফনের যাবতীয় প্রক্রিয়ার জন্য তার পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’

হবিগঞ্জে একজনের মৃত্যু

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে সুনাম উদ্দিন (৫৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার ভাকৈর পূর্ব ইউনিয়নের মমিনা হাওরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুনাম উদ্দিন একই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্গা নেওয়া বোরো জমিতে ছেলে নুরুজ্জামান মিয়াকে নিয়ে ধান কাটছিলেন সুনাম উদ্দিন। কাটা ধান ছেলেকে দিয়ে বাড়ি পাঠাচ্ছিলেন। এ সময় বৃষ্টি শুরু হলে হঠাৎ বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে আশপাশের শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে খবর দেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে লাশ বাড়িতে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পরিদর্শন করেছে।

নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমীন বলেন, ‘নিহতের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’

কিশোরগঞ্জে একজনের মৃত্যু

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। দুপুরে উপজেলার বড় হাওরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত হলুদ মিয়া (৩৭) করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কলাবাগ গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে।

করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে মুসলিমা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সকালে হলুদ মিয়া বড় হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রাঘাত শুরু হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হলুদ মিয়া। পরে স্থানীয় লোকজন লাশ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান।

Translate